November 15, 2018

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

"আমি যখন ক্লাস ওয়ান এ পড়ি, তখন একটা বই ছিলো, খুব সম্ভবত বাংলা বই, বা অন্য বইও হতে পারে। আমার যতদূর মনে পড়ে, এর প্রথম পৃষ্ঠাতেই চারজন মানুষের ছবি আঁকা ছিল। চারজনের সবকিছু একরকম, কেবলমাত্র পোশাক ভিন্ন। প্রথম জন পায়জামা-পাঞ্জাবি ও মাথায় টুপি পরা অর্থাৎ, তিনি মুসলিম তা বোঝানো হচ্ছিলো। দ্বিতীয় জনের পোশাক ধুতি-পাঞ্জাবী , অর্থাৎ তার পোশাক বলছে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের। একইভাবে, তৃতীয় ও চতূর্থ জনেরাও যথাক্রমে ক্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের নির্ধারিত পোশাক পড়ে আছেন। এরকম পোশাক দিয়ে একেকজনের ধর্ম নির্দেশ করা হয়েছিলো। কিন্তু ওইখানের ছবিটায় লোকগুলোর পোশাক বা তারা কোন ধর্ম অনুসরণ করে সেটা দেখানোটা উদ্দেশ্য ছিল না। ছবিটার মূল উদ্দেশ্যটা লুকিয়ে ছিলো অন্য কোথাও। ঐখানে চারজন মানুষ ছিলো যারা একে অপরের হাত ধরে আছে। তারা এক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।

ছোটবেলা থেকে বা মূলত জন্মের পর থেকে, আমার জানা মতে কোনো শিশু কোন ধর্ম অনুসরন করবে তা সে নিজে নির্ধারণ করে না। তার বাবা-মা বা পরিবার যে ধর্ম পালন করে এসেছে তাই তাকে অনুসরণ করতে বলে হয়ে থাকে, এবং সে তাই করে। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠের দেশ। কিন্তু এদেশে সংখ্যা লঘু হলেও অন্যান্য ধর্ম অনুসরণকারী নাগরিকও এদেশে বসবাস করে। সেজন্যই অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও স্বাভাবিক মনমানসিকতা নিয়ে শিশুরা যেন বড় হয়, সেজন্যই হয়তো প্রথম শ্রেনীর ওই বইতে ওই ছবি ছিলো। কারণ আমাদের এই সোনার বাংলা মানুষের জন্য, আর সেই মানুষ যে ধর্মেরই হোকনা কেন, সে মানুষ।

আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শুনেছি, মায়ের ছোটবেলায়, তাদের বাড়ির খুব কাছেই হিন্দুদের বাড়ি ছিল। ঈদের দিন তারা মায়েদের বাসায় এসে সেমাই , পায়েস, পিঠা খেত। আবার পূজার সময় মায়েরা ওদের বাড়ি গিয়ে পূজার প্রসাদ খেত। তাদের মধ্যে চিরকালই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। অথচ আজকে দেখি আমার ছোট ফুপাতো বোনটা হিন্দুদের দোকানে তৈরী মিষ্টি শুনলে ওই মিষ্টি আর খায়না।

আমি প্রায়ই ভাবি এদেশে কি আমার এই বোনের মত আরো অনেকে আছে, যারা অন্য ধর্মের অনুসরণকারীদের মানুষ বলেই বিবেচনা করেনা? তাহলে সামনের দিনগুলোতে একই সমাজে, একই দেশে আমরা বাস করবো কি করে? অন্য ধর্ম বা জাতিকে একরকম ঘৃণা করে যদি আমরা থাকি তাহলে কি এদেশে ঐক্য বা শান্তি বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবে?

এদেশ সকলের দেশ। এদেশে যেকনো ধর্মের ও জাতির সমান অধিকারে বসবাসের অধিকার রয়েছে। আর ঠিক এই বিষয়টি এ যুগের সকল শিশু থেকে প্রাপ্ত বয়স্কদেরও জানা ও বোঝা উচিৎ।

বলা হয়ে থাকে পহেলা বৈশাখই একমাত্র উৎসব যেটি সমগ্র দেশের সকল ধর্মের অনুসারীরা এক হয়ে এই উৎসবটি পালন করে। অথচ এই একমাত্র উৎসবটিকেও কেন্দ্র করেও একটি বিরোধী শক্তি কাজ করছে। এই বাঙালী জাতিকে একত্র করার একমাত্র উৎসবটিকেও পালন করতে বাঁধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

আমি স্বপ্ন দেখি যে একদিন আমরা এ সকল বাঁধা কে অতিক্রম করে সকল উৎসব ও অন্যান্য স্বাভাবিক দিনগুলোও সকল ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে একসাথে মিলেমিশে এক হয়েই থাকব। কারণ আমরা প্রত্যেকেই একই মাটির তৈরী রক্ত মাংসের মানুষ।"

- লিখেছেন সুস্মীতা সাগর দীপ্তি
- ছবি তুলেছেন কুমার বিশ্বজিত