“ছোটবেলায় মায়ের কাছে একজোড়া বুটজুতার আবদার করেছিলাম। মা খাওয়ার চাল বেচে দিয়ে আমার জন্য একজোড়া বুটজুতা কিনে এনেছিলেন। এখন সে কথা মনে হলে ভীষণ কান্না পায়।

যখন কলসিন্দুর স্কুলে ফুটবল খেলতাম, তখন গ্রামের লোকজন সমালোচনা করত, বাজে কথা শোনাত। আমাদের গ্রামের নেতাই নদে সেতু ছিল না। নদ পার হতাম নৌকায়। তখন বেশি সমস্যা হতো আমার। খুব ভোরে ফুটবল অনুশীলন করতে যেতে হতো। নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন ভালো খেলি বলে সবাই আমাকে চেনে। মাঝি আমার জন্য নৌকা রেখে দেন।

আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমার বাবা বীরেন্দ্র মারাত মারা যান। বাবার চেহারা আমার মনে নেই। বাবার একটা ছবিও নেই যে দেখব। বাবা যখন মারা যান, তখন আমার ছোট ভাই দানিয়েল মান্দা ছিল মায়ের গর্ভে। সেই থেকে আমাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে মা এনতা মান্দার লড়াইয়ের শুরু। আমাদের নিয়ে এখনো লড়ে যাচ্ছেন। আমার মা ধানের মৌসুমে ধান লাগান, মৌসুম শেষে ধান কাটার কাজ করেন। এ জন্য দিনে দুই শ টাকা পারিশ্রমিক পান। তবে এবার বোধ হয় আমাদের দুঃখ কিছুটা হলেও ঘুচবে। ১০ লাখ টাকা পেয়েছি। মাকে আর অন্যের জমিতে কাজ করতে দেব না। নিজেদের জন্য কিছু জমি কিনব। একটা ভালো বাড়ি করতে চাই আমি।

আমাকে ফুটবলার বানানোর পেছনে বড় অবদান মায়ের। যখন কলসিন্দুর স্কুলে মফিজ স্যারের কাছে আমরা ফুটবলের অনুশীলন করতাম, গ্রামের অনেক মা–বাবা পড়াশোনার ক্ষতি হওয়ার ভয়ে মেয়েদের খেলতে পাঠাতে চাইতেন না। কিন্তু আমার মা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি আমাকে উৎসাহ দিতেন। কখনো অনুশীলনে যেতে দেরি হলে বকাবকি শুরু করে দিতেন।

বাফুফে ভবনে বছরজুড়ে অনুশীলনে থাকি। অনেক সময় ঈদ, পূজা, ক্রিসমাস ক্যাম্পেই কেটে যায়। মাঝেমধ্যে একটু খারাপ লাগে। কিন্তু ভালো কিছু করতে হলে কষ্ট তো করতেই হবে। আরও ভালো খেলতে হবে। আমার কাছে সবকিছুর আগে বাংলাদেশের পতাকা। মনে হয়, উৎসব তো আগামী বছরও পাব। কিন্তু এই খেলাটা তো আর পাওয়া যাবে না।

আমি যখন বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সিটা পরি, তখন ভীষণ গর্ব হয়। শুধু একটা কথাই মনে হয়, আমি দেশের জন্য খেলতে এসেছি। যখন মাঠে নামি আর যখন জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করে, তখন আমার শরীরে অন্য রকম শিহরণ জাগে। একটা কথাই মনে হয়, আমি দেশের জন্য খেলছি। এটা আমার সারা জীবনের গর্বের বিষয় হয়ে থাকবে।

আমি স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের মেয়েরা একদিন ফুটবলে বিশ্বকাপের জন্য লড়বে। আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা হয়েছি। এএফসি কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসিয়ান, এশিয়ার মধ্যাঞ্চলের দেশগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছি। দেখিয়ে দিয়েছি বয়সভিত্তিক ফুটবলে আমরাই এই অঞ্চলের সেরা। এখন আমাদের লক্ষ্য বিশ্বকাপে খেলা। আমরা বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেভাবেই অনুশীলন করাচ্ছেন আমাদের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। বাফুফের মহিলা কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার আমাদের সুযোগ–সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা করে চলেছেন।

যে একঝাঁক মেয়ে ফুটবল ভবনে একসঙ্গে বেড়ে উঠছি, আমরা সবাই ফুটবলে খাই, ফুটবলে ঘুমাই।

কারণ আমাদের একটাই লক্ষ্য: বিশ্বকাপে খেলা।

***এক ঝলকে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় মারিয়া মান্দার সাফল্য***
* এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় দু’বার চ্যাম্পিয়ন।
* নেপালে ২০১৫ সালে ও তাজিকিস্তান ২০১৬ সালে চ্যাম্পিয়ন।
* থাইল্যান্ডে ২০১৭ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত পর্বে।
* ২০১৭ সালে ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়ন। ভুটানে এ বছর সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ রানার্সআপ।

ছবিটি তুলেছেন – হাসান রাজা
মূল লেখা – প্রথম আলো (তুমুল তারুণ্য)