১৩ জুলাই ২০১৮ সাল। রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে ৫৯তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের (আইএমও) পুরস্কারের মঞ্চ। সোনার পদক নিতে সেই মঞ্চে উঠেছে আমাদের আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী। ১৮ বছরের তরুণটির হাতে বাংলাদেশের লাল–সবুজ পতাকা। ১০০টির বেশি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কোনো গণিত প্রতিযোগিতায় এটিই আমাদের প্রথম অংশগ্রহণ এবং একমাত্র স্বর্ণপদক জয়।

২০১১ সাল, অর্থাৎ এই স্বর্ণজয়ের সাত বছর আগের কথা। ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনের লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডরমিটরি। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির একদল শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো উপস্থিত হয়েছে প্রাথমিক গণিত ক্যাম্পে। সেখানে চট্টগ্রাম থেকে এসেছে ১১ বছর বয়সী জাওয়াদ। জীবনে প্রথমবারের মতো গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েই সে প্রাথমিক ক্যাটাগরিতে হয়ে গেল ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে কিশোর জাওয়াদের জীবনের মোড় ঘুরে গেল। সে দেখতে পেল, পাঠ্যবইয়ের বাইরে আছে এক আশ্চর্য জগৎ। গণিতের জগৎ। পরের বছরগুলোতে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে সে একাধিকবার নিজের ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস হয়েছে। হয়েছে গণিত ক্যাম্পের নিয়মিত সদস্য।

আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী 
 ২০১৬: থাইল্যান্ড আইএমওতে ব্রোঞ্জ পদক 
 ২০১৭: ব্রাজিল আইএমওতে রৌপপদক 
 ২০১৮: রোমানিয়া আইএমওতে স্বর্ণপদক 
 গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ মোট আটবার

গণিত ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা নিয়ে সে এখন বলে, ‘গণিত ক্যাম্প থেকে শিখতে পেরেছি, একটা সমস্যা নিজে থেকে কীভাবে সমাধান করা যায়। কীভাবে সমস্যার গভীরে যেতে হয়। সমাধান করতে না পারলে অন্যের কাছ থেকে সমাধান শিখে নেওয়ার চেয়ে দিনের পর দিন ওই সমস্যার পেছনে লেগে থাকা বেশি আনন্দের।’
জাওয়াদ বলে, গণিতের সবকিছুই তার ভালো লাগে। তবে কম্বিনেটরিকসের প্রতি পক্ষপাত একটু বেশি। এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো শিক্ষার্থী আইএমওর সবচেয়ে কঠিন সমস্যা, ৬ নম্বর সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান করতে পারেনি। কিন্তু প্রথমবার, ২০১৫ সালে জাওয়াদ সেই পথে অনেকখানি অগ্রসর হতে পেরেছিল।

২০১৬ সালে জাওয়াদ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ দলের সদস্য হয়ে থাইল্যান্ডে আইএমওতে গেল। জয় করে আনল ব্রোঞ্জ পদক। পরের বছর ব্রাজিল আইএমওতে গিয়ে পেল রুপার পদক। সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই থাকল সে: এ বছর রোমানিয়া থেকে জয় করে আনল সোনার পদক।

জাওয়াদ বলে, তার গণিতের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাওয়া এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব সাফল্যের পেছনে গণিত অলিম্পিয়াড ও গণিত ক্যাম্পের ভূমিকা বিরাট। বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াড উৎসবের সূচনা ঘটায় দৈনিক প্রথম আলো। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদের অনুরোধে প্রথম আলোর সম্পাদক এর সূচনা করেন ২০০৪ সালের জুন মাসে।

২০১১ সালে প্রথম পাওয়া পুরস্কারের মেডেলের সঙ্গে পেয়েছিল একটা ইন্টারনেট মডেম। সে কথা স্মরণ করে সে বলে, ‘সেই মডেমের মাধ্যমে আমার ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয়। এরপর ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।’ আর আছে মা সৈয়দা ফারজানা খানম ও বাবা আহমেদ আবু জোনায়েদ চৌধুরীর উৎসাহ–অনুপ্রেরণা—এটা জাওয়াদ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানাল।

জাওয়াদ বলে, ‘আমি তিনবার আইএমওতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছি। তিনটি নতুন দেশে গিয়েছি। বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে পেরেছি, অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রচুর। অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। বিখ্যাত গণিতবিদদের দেখেছি, শুনেছি তাঁদের কথা। নানা দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাববিনিময় হয়েছে।’

জাওয়াদ আরও বলে, গণিতের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, একটা বড় সমস্যা একবারে সমাধান না করে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করলে পুরো সমস্যাটার সমাধান সহজ হয়। কখনো মনে হয়েছে, নতুনভাবে চেষ্টা করা যায়। এটা শুধু গণিতের ক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনেও সত্য বলে তার বিশ্বাস। এভাবে গণিত জাওয়াদের জীবন সম্পর্কে ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

লিখেছেন – মুনির হাসান
ছবি – প্রথম আলো