তিনি যে এলাকায় বেড়ে উঠেছেন, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বলে যে কিছু আছে, তা জানার সুযোগ ছিল না। ছেলেটি প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেখেন দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। কিন্তু বছর তিনেক পরে তিনি নিজেই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে।

এটা তাঁর অধ্যবসায়ের ফল।

Niswi Mong Marma এর জন্ম বান্দরবানের থানচির বলিপাড়া ইউনিয়নের বাগানপাড়া গ্রামে। মা-বাবা দিনভর কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন। তাঁরা ছেলেকে পাঠান থানচির বলিপাড়ার ‘করুণা শিশুসদন’ নামের এক আশ্রমে। নিশৈমং সেখানে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরের তিন বছর কাটান রুমা উপজাতীয় আবাসিক উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকার নটর ডেম কলেজে। নিশৈমংয়ের ভাষায় সেটাই ছিল তাঁর জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’: সবকিছুর শুরু সেখানেই।

নিশৈমংদের মাতৃভাষা মারমা। কিন্তু মারমা ভাষায় লেখা শিখতে পারেননি। কারণ, বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চলে বাংলায়। বাংলা তাঁর কাছে নতুন এক ভাষা। প্রথম প্রথম খুব সমস্যা হতো। কলেজে উঠে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বাংলা সাহিত্য ঘেঁটে দেখার সুযোগ হয়। পড়তে পড়তে আচ্ছন্ন হলেন, যেন এক নতুন এক জগৎ খুঁজে পেয়েছেন। নানা লেখকের বই পড়তে থাকেন। নিশৈমংয়ের ভাষায়, ‘তখন বুঝতে পারি, জ্ঞানের কত বড় ক্ষেত্র এটা, আর আমরা কতখানি বঞ্চিত।’

এই ভাবনা থেকেই পরে বান্দরবানের থানচির ওই আশ্রমে পাঠাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। নাম দেন ‘জ্ঞানশ্রী মহাথেরো পাঠাগার’। নামটি দিয়েছেন করুণা শিশুসদনের পরিচালক গাইদামালা (বাংলায় ‘জ্ঞানশ্রী’) মহাথেরোর নামানুসারে। তাঁর কাছেই নিশৈমংয়ের শিক্ষাজীবনের শুরু। এখন ছুটিতে বান্দরবানে গেলে নিশৈমংয়ের বেশি সময় কাটে আশ্রমেই। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে পাঠাগারের বইগুলো আশ্রমের শিক্ষার্থীদের পড়ে শোনান। প্রয়োজনে মারমা ভাষায় বুঝিয়ে দেন।

নিশৈমং তাঁর এলাকায় পাঠাগার গড়ার ইচ্ছা প্রথম প্রকাশ করেন ফেসবুকে। গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি। কেউ বই দিয়ে, কেউ বই কেনার জন্য অর্থ দিয়ে তাঁকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন। সময়ে সময়ে তিনি ফেসবুকে কাজের অগ্রগতির কথা জানাতেন। এভাবেই এগিয়ে চলে ‘জ্ঞানশ্রী মহাথেরো পাঠাগার’। এখন সেখানে মোট ১১০০ বই আছে।

নিশৈমং প্রথম আলোকে বলেন, থানচি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া প্রথম মারমা শিক্ষার্থী তিনি। এ ঘটনা তাঁর এলাকায় বেশ আলোড়ন তুলেছে। আর তাঁর মধ্যেও এনে দিয়েছে একটা দায়িত্ববোধ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আশ্রমের শিক্ষার্থীদের তিনি পড়ান, তাদের উচ্চশিক্ষার দিকনির্দেশনা দেন। এতে খুদে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয়। এই অনুপ্রেরণাই তাদের সবচেয়ে বেশি দরকার বলে মনে করেন নিশৈমং। বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ হলো স্বপ্ন তৈরি করা।’

এই স্বপ্ন তৈরিতে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে মজার মজার সব কাজ করেছেন তিনি। বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোযুক্ত পোশাক চেয়ে নিতেন। আবার এই লোগো আছে, এমন খাতা-কলম কিনে নিতেন। এরপর থানচিতে গিয়ে বিতরণ করতেন সেগুলো। যদি কেউ খানিকটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, এটা কী? তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তাঁদেরকে জানানোর সুযোগ হবে। সেখানে পড়াশোনা করার কথা বলা যাবে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ার কথা তারা জানেই না। এ জন্য মাঝেমধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় কর্মশালার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
পার্বত্য অঞ্চলে অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী আছে। কেউ ছবি আঁকায় পারদর্শী, কেউবা খেলাধুলায়। দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা উঠে আসতে পারছে না বলে মনে করেন নিশৈমং। তাই নিজের সাধ্যমতো ওদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বাড়ি গেলে শিশু–কিশোরদের জন্য ছোটখাটো খেলনা নিয়ে যান, তাদের কমিক বই উপহার দেন, ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেন, অনুপ্রেরণামূলক চলচ্চিত্র দেখান। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রজন্মের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।’

আর নিজের জন্য কী ভাবছেন নিশৈমং? দেশে হোক বা বিদেশে, উচ্চশিক্ষা নিতে চান। কর্মজীবনে সামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে চান। তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার বিস্তারের জন্য কাজ করা।’
কার্টুনের মীনার সঙ্গে নিশৈমং মারমার খুব মিল। প্রদীপ থেকে দৈত্য বেরিয়ে মীনাকে যেমন বলে, তোমার তিনটি ইচ্ছা কী? ধনসম্পদ বাদ দিয়ে মীনা চাইল গ্রামবাসীর সুস্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা আর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা। আমাদের নিশৈমংয়েরও তিনটি ইচ্ছা—একটি পাঠাগার, মারমাদের বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করা আর যে আশ্রমে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানকার শিশু–কিশোরদের জীবনযাপনের মানোন্নয়ন। খুব সাধারণ ইচ্ছা।

নিশৈমংয়ের কাছে জাদুর কুপি নেই। দৈত্য এসে ইচ্ছাপূরণের বর দেয় না। তাতে অবশ্য দমে যাননি নিশৈমং। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আলো ছড়ানোর।

লিখেছেন – মেহেদী হাসান
ছবি – প্রথম আলো

 #SpreadPositivity #PositiveBangladesh#WeArePositiveBangladesh #P2PChallenge