খাওয়া নিয়ে মাকে যাতে জ্বালাতন না করি, সে জন্যই আমাকে নাচের ক্লাসে দিয়ে দেওয়া হয়। বাবা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, নাচ করলে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ব। ক্লান্তি ক্ষুধা বাড়াবে, খেতে আমাকে হবেই। আমাকে খাওয়াতে তখন মায়ের আর কষ্ট হবে না। এই হলো আমার নাচ শুরুর গল্প।

নাচ এমন এক শিল্পমাধ্যম, যা একেবারে শিশুকাল থেকে শুরু করতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমার শুরুটা হয়েছিল সেই সময়েই। ভরদুপুরে নানির সঙ্গে টুকটুক করে নাচের ক্লাস করতে যেতাম। ক্লাসে কোনোক্রমেই যাতে অনিয়মিত হয়ে না পড়ি, সে জন্য মা সব সময়ই ছিলেন তৎপর। মা-খালারা ছায়ানটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা গান করতেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁদের সঙ্গে ছায়ানটে যেতাম, তাঁদের গান শুনতাম। বেশ ভালো লাগত। আমার মা এমন এক পরিবারের মেয়ে ছিলেন, যেখানে যথেষ্ট শ্রদ্ধার সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চা করা হতো। নানাদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় পারদর্শী ছিলেন। কেউ এসরাজ, কেউ বাঁশি, আবার কেউ বা তবলা বাজাতেন। বাদ্যযন্ত্রের এই দক্ষতাকে অবশ্য তাঁরা পেশা হিসেবে নেননি। অন্যদিকে বাবার চাকরির সুবাদে বেড়ে উঠেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। সব মিলিয়ে সার্বক্ষণিক একটা সাংস্কৃতিক বলয়ের ভেতরে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। ফলে নাচ শুরু করার পর আর কোথাও থামতে হয়নি। পরিবারের রীতিই ছিল, কোনো কাজ শুরু করলে সেটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই করতে হবে। নাচটাও আমাকে সেভাবেই করতে হয়েছে।

যাঁরা নাচ শিখতে চান, তাঁদের প্রত্যেকেরই উচিত শাস্ত্রীয় নাচ দিয়ে শুরু করা। যদিও শাস্ত্রীয় নাচ একটু কঠিন। কিন্তু করতে করতেই একসময় সেটা সহজ হয়ে আসে। মানুষের ভেতরে পোক্ত হয়ে গেঁথে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে। ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে শুরু হয়েছিল আমার নাচ শেখা। মণিপুরি নাচে হাতেখড়ি হয় শ্রীমতী শান্তিবালা সিনহা ও তামান্না রহমানের কাছে। পরে শিক্ষক হিসেবে পাই শর্মিলা বন্দ্যাপাধ্যায়কে। ভরতনাট্যম শিখেছিলাম ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন খানের কাছে। পরে ধীরে ধীরে কলকাতার গুরুজিদের সান্নিধ্য পেয়েছি। মণিপুরি নাচে আমরা গুরু বিপিন সিংয়ের নৃত্য ঘরানা অনুসরণ করি। আমার পরম সৌভাগ্য যে এই নাচের এই কিংবদন্তিকে স্বচক্ষে দেখেছি। তাঁর মৃত্যুর সময়টাতে ওখানেই ছিলাম বলে শেষ দেখাটা দেখতে পেরেছিলাম। একটা সময় ভারতীয় হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে বছরে দুবার মণিপুরি নাচের কর্মশালা হতো। সেখানে শেখাতে আসতেন বিপিন সিংয়ের স্ত্রী গুরু শ্রীমতী কলাবতী দেবী। ওই কর্মশালাতেই প্রথম তাঁর সান্নিধ্য পাই। শিখতে শুরু করার পর সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকেই।

নাচ করতে করতে একটা সময় পরিণত বয়সে পৌঁছে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জেতার পর নাচটা আমার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নাচ করে যখন প্রশংসিত হচ্ছিলাম, বন্ধুবান্ধব আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাহবা পাচ্ছিলাম, তখন দায়িত্বটা আরও বেড়ে গেল। তত দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর শেষ করেছি। আফসোস রয়ে গেল, নাচ নিয়ে তো পড়ালেখা করা হলো না। নৃত্যকলায় স্নাতক করার মতো সময়, সুযোগ বা বয়স তখন আর নেই। শেষে কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকলায় স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়ে গেলাম। সেটা ছিল আমার নবজন্ম। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেলাম শ্রীমতী কলাবতী দেবীকে। নিজের বাড়িতে রেখে, নাচ শিখিয়ে যে সহযোগিতা সে সময়ে তিনি করেছেন, তার তুলনা হয় না। নাচের শিক্ষার্থী হিসেবে এটা ছিল আমার জীবনের এক বিরাট পাওয়া। নাচটা আসলে কী, কীভাবে করা উচিত, কীভাবে ছোটদের শেখানো উচিত, কীভাবে এটা ধরে রাখা যায়, সেসব তাঁর কাছেই শিখেছি।

নৃত্যশিল্পীদের সংগ্রামটা খুব দীর্ঘ। এই দীর্ঘ আর বন্ধুর পথে সাফল্যও পেয়েছি অনেক। বন্ধু, পরিচিতজনেরা যখন বলে, আমার কাজ তাঁদের ভালো লেগেছে, সেটাই আমার সাফল্য। সফল হতে আমাকে অনেক শো করতে হবে, অনেক টাকা আয় করতে হবে বা অনেক পুরস্কার পেতে হবে তা নয়।

২০০৭ সালে শিল্প ও শিক্ষানুরাগী জিনাত আফরোজার সহায়তায় শুরু করেছিলাম নাচের স্কুল ‘ভাবনা’। তবে ওই সময়টাতেই পড়ার জন্য ভারতে চলে যেতে হয়েছিল। মাঝেমধ্যে এসে ঢাকায় এসে ক্লাস নিয়ে যেতাম। পরে ২০১০ সালে ফিরে এসে পুরোদমে স্কুলের কার্যক্রম চালিয়ে যাই।

নাচ শেখা তো হলো, কিন্তু চর্চাটা এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। আমাদের দেশে শাস্ত্রীয় নৃত্যের ক্ষেত্রটা বড় হলেও চর্চার ক্ষেত্রটা সেই অর্থে বাড়েনি। এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেক গুছিয়ে নাচ শিখছে। কিন্তু ক্ষেত্রটা প্রশস্ত না হলে এই শিল্পীদের কী হবে? বাধ্য হয়ে শাস্ত্রীয় নাচকে ভেঙে আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে গানের নাচ, ফোক—এগুলোর সমন্বয়ে একটা ভিন্ন ঘরানার নাচের ওপর।
নাচ একটা ব্যয়বহুল শিল্পমাধ্যম। একে ধরে রাখা, নিজের ভেতর বাঁচিয়ে রাখা অনেক কঠিন। কেননা, নাচের পোশাকের খরচ অনেক। এ ছাড়া নাচ শিখতে কখনো দেশের বাইরে কর্মশালায় যেতে হচ্ছে, নাচের দল চালাতে হচ্ছে। এসবের খরচ কিন্তু অনেক। সেই তুলনায় এই শিল্পমাধ্যম থেকে আয় খুব নগণ্য। অর্থ উপার্জনের জন্য জনপ্রিয় ধারার নাচ আর বাণিজ্যিক প্রদর্শনীতে অংশ নিতে হচ্ছে। আর সেসব করতে গিয়ে প্রায়ই নিজের ক্ষেত্র ও রুচি থেকে অনেকের ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়। এসব কারণে এগোতে হয় খুব সাবধানে। সব সময় নিজের কাজের মান ধরে রাখতে চেষ্টা করেছি, ভবিষ্যতেও করব। লোকে পছন্দ করলেই তো আর কুরুচিপূর্ণ নাচ করা যাবে না।

নারী নৃত্যশিল্পীদের মাতৃত্বকালীন সময়টায় একটা স্থবিরতা চলে আসে। ওই সময়ে মনে হয়, জীবন থেকে একটা দীর্ঘ সময় চলে গেল যখন, একেবারে কিছুই করা হলো না। সেই সময়েও আমি নাচের সঙ্গে ছিলাম। নিজে নাচতে পারিনি, কিন্তু শেখানো অব্যাহত রেখেছিলাম। শিল্পীমন তো থমকে থাকার নয়। তবে কখনো হতাশায় আচ্ছন্ন হইনি তা নয়। সব সময়ই মনে হয়েছে, কী করে চলব! খরচের সঙ্গে তো পেরে ওঠা মুশকিল। শুধু শারীরিক সক্ষমতা, সৃষ্টিশীল মন আর রুচি থাকলেই তো হবে না। এগুলোকে যূথবদ্ধ করে কাজ করার জন্য চাই মঞ্চ, মানুষ ও গণমাধ্যমের সমর্থন, ভালো অনুষ্ঠান আর অর্থ। এগুলোর সমন্বয় হলেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সব সময় সেটা হয় না।

নৃত্যশিল্পীদের সংগ্রামটা খুব দীর্ঘ। এই দীর্ঘ আর বন্ধুর পথে সাফল্যও পেয়েছি অনেক। বন্ধু, পরিচিতজনেরা যখন বলে, আমার কাজ তাঁদের ভালো লেগেছে, সেটাই আমার সাফল্য। সফল হতে আমাকে অনেক শো করতে হবে, অনেক টাকা আয় করতে হবে বা অনেক পুরস্কার পেতে হবে তা নয়। এমনকি আমার নাচ যেসব স্তরের মানুষের ভালো লাগতেই হবে, এমনও নয়। শুধু এইটুকু নিশ্চিত করতে চেয়েছি, আমার কাজের ভেতরে যাতে আমার রুচি, শিক্ষা, সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকে। যে কাজের মাধ্যমে একটা স্বাস্থ্যকর, ইতিবাচক বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, সেই কাজই করতে চাই। এইটুকুতে মানুষের যে ভালোবাসা, তাতেই আমার আনন্দ।

এমন সুযোগ অনেকবার এসেছে আমার জীবনে। ছায়ানটের উৎসবগুলোয় নাচ করেছি, কলকাতায় ট্যাগর সেন্টারের উদ্বোধনী মঞ্চে, ২০০৯ সালে মুম্বাইয়ের ‘কাল কি কলাকার সম্মেলন’-এ, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার্ল্ড ড্যান্স অ্যালায়েন্সের আয়োজনে একটি নাচের অনুষ্ঠানে, ২০১২ সালে রাশিয়ায় তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক ফেস্টিভ্যালে, একই বছর কোরিয়ায় এশিয়ান ড্যান্স ওয়ার্কশপসহ আরও অনেক অনুষ্ঠানে নাচ করেছি। ২০১৩ সালে কলকাতায় বাংলা গানের উৎসব করেছিল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও ভারতের আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমি। সেখানে আমাদের নাচের দল ভাবনা ‘ভানু সিংহের পদাবলী’ পরিবেশন করেছিল। বড় বড় গুণী ওস্তাদ সেই ড্যান্স থিয়েটার দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আসন থেকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন। সেটাও চোখে পানি এনে দিয়েছিল। আর কর্মশালা করানোর সুযোগ হয়েছিল বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে।
জীবনে পুরস্কার আর প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি। আমাকে প্রথম হতে হবে, পেতেই হবে, কেড়ে নিতে হবে—এমন প্রতিযোগিতাকে আমি সব সময় এড়িয়ে চলেছি। তবে নিজেকে বিচার করার জন্য মাঝেমধ্যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ভালো। আমাদের দেশে ইতিবাচক, সুস্থ ও যৌক্তিক প্রতিযোগিতাটা হয় না। ভুল প্রতিযোগিতায় পড়লে শিশুদের উৎসাহ-উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শিশুর জীবনে এ ধরনের প্রতিযোগিতা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমি যেসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি, সেসবের প্রায় সব জায়গাতেই পুরস্কৃত হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের প্রতিযোগিতায় পরপর তিনবারে চারটি স্বর্ণপদক পেয়েছি। শেষবার একসঙ্গে ফোক ও ক্লাসিক্যাল—দুটোতেই স্বর্ণপদক পাই। পেয়েছি সিঙ্গার মনি অ্যাওয়ার্ড, নটরাজ মিউজিক অ্যান্ড ড্যান্স একাডেমি থেকে পেয়েছি নাট্যসারথি অ্যাওয়ার্ড।

নাচটা এমন একটা সৃষ্টিশীল মাধ্যম যে এটা হতাশাও দূর করে দেয়। আমরা নৃত্যশিল্পীরা খুব অল্পতে খুশি হই। কঠোর পরিশ্রম করে একটি অনুষ্ঠান করার পর সেটা দেখে মানুষ যখন বলে, বাহ্, ওইটুকুতেই আমাদের আনন্দ হয়। সব ক্লান্তি, হতাশা, দুঃখ, অপ্রাপ্তির বেদনা ঘুচে যায়।

সামিনা হোসেন: নৃত্যশিল্পী

সূত্র – প্রথম আলো

 #PositiveNewsroom #SpreadPositivity #PositiveBangladesh#WeArePositiveBangladesh #P2PChallenge