খবরটা আমাকে প্রথম দিয়েছিলেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জলঢাকা কার্যালয়ের যোগাযোগ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রাসেল। আমি নাকি একটা পুরস্কার পেয়েছি। কিসের পুরস্কার, কী ধরনের পুরস্কার—তখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। যখন আমার বাসায় সাংবাদিকেরা আসা-যাওয়া শুরু করলেন, পত্রিকায় আমাকে নিয়ে লেখা হলো—তখন বুঝলাম, সত্যিই বড় একটা কিছু ঘটে গেছে। শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ আমাকে ‘ইয়ুথ কারেজ অ্যাওয়ার্ড ফর এডুকেশন’ দিয়েছে গত বছর। এই পুরস্কার আমার কাজকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা দিয়েছে। এখন কাজের গতি ও পরিধি বেড়ে গেছে আরও বড় পুরস্কারের নেশায়। যত বাধাই আসুক, বড় লক্ষ্য, বড় স্বপ্ন সামনে রেখে কাজ করলে যে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়, এই শিক্ষা আমি খুব ছোটবেলায়ই পেয়েছি।
১৯৯৫ সালের ২৫ মে নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের বিন্যাকুড়ি গ্রামে আমার জন্ম। আমার জন্মের এক বছর পর আরও একটি ভাই হয়। তার নাম রঞ্জিত। চারজনের সংসার মা-বাবার দিনমজুরির অর্থে ভালোই চলছিল।
২০০৬ সাল। তখন আমার বয়স ১১ বছর। আমি বিন্যাকুড়ি দ্বিমুখী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। হঠাৎ বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ল। অস্ত্রোপচার করে পাথর সরানো হলেও বাবা আগের মতো আর কাজ করতে পারছিলেন না। এর তিন মাস পর মায়েরও হৃদ্ন্ত্রে অস্ত্রোপচার হলো। ফলে কাজে যেতে পারছিলেন না তিনিও। অভাব-অনটনের কষ্ট এর আগে কখনো পাইনি। আমি ছোট মানুষ, তবু বুঝলাম পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের হালটা আমাকেই ধরতে হবে।
প্রথমে কাজ শুরু করলাম ইটভাটায়। তাতেও যখন সংসার চলছিল না, ইটভাটায় দিনে কাজ করার পর রাতে কাজ নিলাম আমার স্কুলের পাশের একটা ভাঙারির দোকানে। এভাবে কোনোমতে সংসার চলছিল। একপর্যায়ে আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে আমার কাজে খুশি হয়ে ভাঙারি দোকানের মালিক আমাকে নিয়মিত কাজের সুযোগ করে দিলেন। প্রতিদিন মজুরি হিসেবে ৫০ টাকা পেতাম। যেহেতু ভাঙারির দোকান স্কুলের পাশেই ছিল, সেখানে কাজ করার সময় প্রায়ই স্কুলের বন্ধুদের চোখে পড়ে যেতাম। ওরা বলত, ‘কিরে, স্কুলে না এসে এখানে কাজ নিয়েছিস কেন?’ অনেকে ইয়ার্কির ছলে নানা রকম কথাও বলত। স্কুলের ঘণ্টা যখন বাজত, তখন বুকটা কেঁপে উঠত। ভেতরে-ভেতরে কেমন যেন একটা ব্যাকুলতা কাজ করত। খুব ইচ্ছা হতো আর দশজনের মতো বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যেতে। প্রবল ইচ্ছাকে কিছুতেই দমিয়ে রাখতে পারছিলাম না।

এখন জলঢাকা উপজেলাসহ আশপাশের উপজেলাগুলোয় বাল্যবিবাহের প্রবণতা অনেক কমেছে

২০০৭ সালের কথা, সিদ্ধান্ত নিই, আমি আবারও স্কুলে ভর্তি হব। কিন্তু কীভাবে? বাবা-মা কি স্কুলে যেতে দেবেন? আমি স্কুলে গেলে সংসারের কী হবে? পরামর্শ নেওয়ার জন্য একদিন গেলাম আমার প্রতিবেশী এক বড় ভাই কাঞ্চন রায়ের কাছে। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে মাস্টার্স পড়ছেন। তিনি তখন ছিলেন গ্রামের বিন্যাকুড়ি সূর্যমুখী শিশু সংগঠনের সভাপতি। সংগঠনটি শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করত।
কাঞ্চনদাকে বললাম, আমি পড়তে চাই, আবারও স্কুলে যেতে চাই। তিনি কিছু পরামর্শ দিলেন। একদিন বিকেলে স্কুলমাঠে আমাকে ও বাবাকে ডেকে এনে অনেক সময় ধরে বোঝালেন।
বাবা বললেন, পড়তে চাইলে পড়, কিন্তু দোকানের চাকরিটা তো তোকে করতেই হবে।

খুব আনন্দ হয়েছিল সেদিন। ভাবলাম কাজ করব, স্কুলেও যেতে পারব—এর চেয়ে বেশি কিছু তো আমি চাইনি। আমার মজুরির টাকায় সংসার চলছিল, তবু একটু একটু করে কিছু টাকা সঞ্চয় করছিলাম। ৯০০ টাকা জমা হয়েছিল। সেই টাকা দিয়েই ২০০৭ সালে আমি আবার স্কুলে ভর্তি হলাম সপ্তম শ্রেণিতে। ভর্তি হতে ৩০০ টাকা আর বই কিনতে লাগল ৬০০ টাকা। শুরু হলো আমার নতুন জীবন। নিয়মিত লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করতাম ভাঙারির দোকানে।

এই সময়টাতেই লক্ষ করলাম, আমার গ্রামের মেয়েদের খুব অল্প বয়সে বিয়ে হচ্ছে। আর বিয়ে হওয়ার কারণে তাদের আর পড়ালেখা হচ্ছে না। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল চরম পর্যায়ে।

স্কুলে ভর্তির পর আমি বেসরকারি সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও স্থানীয় এনজিও উদয়াঙ্কুর সেবা সংস্থার সহযোগিতায় বিন্যাকুড়ি সূর্যমুখী শিশু সংগঠনের সদস্য হলাম। সংগঠনের সদস্য হওয়ার পর তারা আমাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিল। সে সময়েই আমি বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারলাম। এরপর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে জানাতে শুরু করলাম। পাশাপাশি ঝরে পড়া শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্কুলমুখী করার কাজ শুরু করলাম। পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কষ্ট যে কী প্রবল, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে!

আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তৎকালীন জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সহিদুল ইসলাম আমাকে কাজগুলো চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আরও উৎসাহী করলেন। সুপরামর্শ দিলেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও আমাকে এ কাজে সহযোগিতা করলেন। একে একে গ্রাম থেকে ইউনিয়ন এবং গোটা উপজেলায় শুরু হয় আমার কার্যক্রম। এ পর্যন্ত ১৬০টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পেরেছি।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সহযোগিতায় বাংলাদেশের শিশু প্রতিনিধি হিসেবে আমি ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কায় শিশু সম্মেলন ও ২০১৩ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শিশু সম্মেলনে যোগ দিই। এসব সম্মেলনে অংশ নিয়ে পাকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, শিশু সুরক্ষা এবং শিশু অধিকারের বিষয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। যৌন হয়রানি, স্কুলে বেত্রাঘাত, শিশু অপহরণ ও বাল্যবিবাহ শিশুর সার্বিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশের সুনাগরিক গঠনে এসব বাধা অতিক্রম করা খুব জরুরি। আমাদের জলঢাকা উপজেলাকে শিশুবান্ধব ও বাল্যবিবাহমুক্ত করার লক্ষ্যে এরপর থেকেই আরও বিপুল উদ্যমে কাজ করতে শুরু করলাম।

এর মধ্যে ২০১২ সালে স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হলাম জলঢাকা বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০১৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করলাম। এতসবের মধ্যেও সংসারের অর্থ জোগান দিতে আমাকে এবং আমার ভাইকে মাঝেমধ্যে কাজের সন্ধানে যেতে হতো ঢাকা, কুমিল্লা, বগুড়া, চট্টগ্রাম ও সিলেটে।
২০১৪ সালের ১২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ ভবনে মালালা দিবসের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক বিশেষ দূত ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের হাত থেকে আমার পক্ষে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ‘ইয়ুথ কারেজ অ্যাওয়ার্ড ফর এডুকেশন’ পুরস্কার গ্রহণ করে। ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ওই পুরস্কার আমার হাতে তুলে দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি ও কানাডীয় হাইকমিশনার। সেই সঙ্গে ‘প্ল্যান গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড ভলান্টিয়ার অব দ্য ইয়ার ২০১৪’ পুরস্কারও আমি পেয়েছিলাম। ২০১৫ সালে আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ইয়াং বাংলার পক্ষ থেকে ‘জয়বাংলা অ্যাওয়ার্ড’ আমার হাতে তুলে দেন। এসব পুরস্কার আমার আত্মবিশ্বাস আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান হাবিব এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও উদয়াঙ্কুর সেবা সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। আমাদের কাজ যে বেশ ভালোই এগোচ্ছে, তার প্রমাণ পেয়েছি গত ৩০ মার্চ। এই দিন বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ দিলওয়ার বখ্ত জলঢাকাকে বাল্যবিবাহমুক্ত উপজেলা ঘোষণা করেছেন।

এখন আমি এসব কাজের পাশাপাশি নীলফামারী সরকারি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছি। পাশাপাশি প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘হেল্পিং চিলড্রেন গ্রোয়িং অ্যাজ অ্যাকটিভ সিটিজেন’ প্রকল্পে এনসিটিএফের ইয়ুথ ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছি।

এখন জলঢাকা উপজেলাসহ আশপাশের উপজেলাগুলোয় বাল্যবিবাহের প্রবণতা অনেক কমেছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি যুব-যুবাদের নিয়ে তাদের কাজের দক্ষতা ও জ্ঞান বিকাশে এবং সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি। যেন লেখাপড়ার পাশাপাশি তারা নিজের জন্য, সমাজের জন্য এবং সর্বোপরি দেশের উন্নয়নে তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে পারে। ভবিষ্যতে আমি তথ্যপ্রযুক্তি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করতে চাই। দেশের সুশীল সমাজ এবং জনপ্রতিনিধিরা শিশু সুরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন এবং দেশকে সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবেন, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এই কামনাই করি।
কেশব রায়: বাল্যবিবাহ-বিরোধী প্রচারক, জলঢাকা উপজেলা, নীলফামারী

সূত্র – প্রথম আলো

 #PositiveNewsroom #SpreadPositivity #PositiveBangladesh#WeArePositiveBangladesh #P2PChallenge