December 6, 2018

গল্পের নয়, বাস্তবের রানির সঙ্গে দেখা

https://www.prothomalo.com/we-are/article/1527941/%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A7%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%BE কুইন্স ইয়াং লিডারস অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে আমি আর আয়মান সাদিক যেদিন রওনা হলাম, সেটা ছিল ঈদের দিন, ১৬ জুন। সবাই যখন ঈদের নতুন জামা পরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করছে, আমরা দুজন তখন দীর্ঘ ভ্রমণের সঙ্গে মানানসই ঢিলেঢালা পোশাক পরে পরিবারের মানুষগুলোকে বিদায় জানাতে ব্যস্ত। ‘সুখের মতো ব্যথা’ বোধ হয় একেই বলে!

যাহোক। শুরু হলো এমন একটা গন্তব্যের দিকে যাত্রা, যে গন্তব্য আমার স্বপ্নের চেয়ে বড়।

১৬ তারিখ রাতে লন্ডনে পৌঁছালাম। বিমানবন্দরে নেমে যখন কেমব্রিজের দিকে রওনা হলাম, ভ্রমণক্লান্তি ছাপিয়ে রোমাঞ্চটাই টের পাচ্ছিলাম বেশি।

পরের কয়েক দিনের জন্য আমাদের ঠিকানা হলো কেমব্রিজের ম্যাডিংলে হল। সেখানে এবারের কুইন্স ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ড-জয়ীদের জন্য বিশেষ কিছু ক্লাসের আয়োজন করা হয়েছিল। নেতৃত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে পড়ালেখা, ক্লাসের ফাঁকেও আমরা কেমব্রিজ ঘুরে দেখার যথেষ্ট সময় পেয়েছি। স্টিফেন হকিংয়ের বাসা, বিজ্ঞানী নিউটন ও ডারউইনের পড়ার বা কাজের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে দারুণ লাগছিল।

২০ জুন গেলাম লন্ডনে। যেখানে ছিলাম, জায়গাটা ব্রিটিশ লাইব্রেরির খুব কাছে। বাকিংহাম প্যালেসের অতিথি হওয়ার দিনটা যত এগিয়ে আসছিল, ততই বুকের ভেতর ধুকপুক করছিল।

২২ জুন আমরা বিবিসির অফিস ঘুরে দেখলাম। বার্তাকক্ষ, স্টুডিও, কীভাবে তারা কাজ করে, সবই দেখার অভিজ্ঞতা হলো খুব কাছ থেকে। সবচেয়ে মজার ছিল তাদের আন্তর্জাতিক বিভাগ। এই বিভাগের সব কটি ডেস্ক একই তলায়। একেকটা ডেস্কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একেকটা ভাষা কানে আসছিল। মনে হচ্ছিল, ভুল করে আমরা একটা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার ভেতর ঢুকে পড়েছি!

সে রাতে ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার জন মেজর কেজি সিএইচের আমন্ত্রণে আমাদের নৈশভোজের বন্দোবস্ত হলো গোরিং হোটেলে। (হোটেলটির একটা বিশেষত্ব আছে। ২০১১ সালে যখন ধুমধাম করে প্রিন্স উইলিয়াম এবং কেট মিডলটনের বিয়ে হলো, নববধূ তখন এই হোটেলেই ছিলেন।) স্যার জন মেজরের আরেকটা পরিচয় হলো, তিনি কুইন্স জুবিলি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। কুইন্স ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ড পাওয়া বিভিন্ন দেশের ৬০ জন তরুণের প্রত্যেকের সঙ্গেই তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বললেন।

২৫ জুন আমরা গেলাম কমনওয়েলথ ভবনে। সেখানে তাদের নীতিগুলো নিয়ে আলোচনা হলো। এরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, টেন ডাউনিং স্ট্রিট ঘুরে দেখলাম। সেখানে সবার আন্তরিকতায় সময়টা কেটেছে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে। কেবিনেট রুমে বসে প্রশ্ন করার সুযোগও আমরা পেয়েছি। এই পর্বটি শেষ হয় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি আমাদের অভিনন্দন জানান। পরে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তিনি আমাদের কাজের খোঁজখবর নিয়েছেন।

অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, ২৬ জুন। আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। সকালে আমাদের ফেসবুক কার্যালয় ঘুরিয়ে দেখানো হলো। অফিসটা দেখে মনে হচ্ছিল, এটা একটা শিশুপার্ক! যেন এখানে কেউ কাজ করতে নয়, আনন্দ করতে আসে! ঢাকায় যেখানে সকালের নাশতা খেতে খেতে আমরা ফেসবুকের হোমপেজ স্ক্রল করি, সেখানে খোদ ফেসবুক অফিসে বসেই সেদিন সকালের নাশতা করার সুযোগ হলো! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্কে একটা বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করা হয়েছিল আমাদের জন্য। ফেসবুকের নতুন সব ফিচার, ফেসবুককে কীভাবে মার্কেটিংয়ের কাজে লাগানো যায়...শেখানো হলো নানা কিছু।

বিবিসির অফিসে আয়মান সাদিক ও জায়বা তাহিয়াবিবিসির অফিসে আয়মান সাদিক ও জায়বা তাহিয়াবাকিংহাম প্যালেসের পুরো সময়টা ছিল স্বপ্নের মতো। মনে হচ্ছিল এখনই ঘুমটা ভেঙে যাবে আর আমি আমার ঘরের বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করব! একটা বাসে করে আমাদের বাকিংহাম প্যালেসে নিয়ে যাওয়া হলো। ভেতরে ঢোকার আগে দেখলাম, বহু দর্শনার্থী প্রাসাদটা বাইরে থেকে দেখতে এসেছে। তারা ছবি তুলছে। হঠাৎ মনে হলো, কী আশ্চর্য! যে রানিকে একনজর দেখার আশায় এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসে, স্বয়ং তাঁর অতিথি হয়েই আমরা আজ এখানে এসেছি! বাসটা যখন বাকিংহাম প্যালেসে ঢুকে পড়ল, আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে কিছুক্ষণের মধ্যে নিশ্চয়ই আমার ঘুমটা ভেঙে যাবে! শুরুতে আমাদের পুরো অনুষ্ঠানের একটা মহড়া করে নিতে হলো। এ সময় হাজির হলেন ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ফুটবলার ডেভিড বেকহাম। পৃথিবীটা বদলে দেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই আনাচকানাচে আরও অনেক তরুণ কাজ করছে, এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বললেন, তিনি চান, তাঁর সন্তানেরাও আমাদের মতো হোক। সুযোগ ছিল, কিন্তু আমি তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। রানির হাত থেকে মেডেল নেওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে এল, আমি যেন আরও নার্ভাস হয়ে পড়লাম। আয়মান আমাকে অভয় দিয়ে বলল, ‘এটা কোনো ব্যাপারই না! স্কুলে প্রিন্সিপালের হাত থেকে কখনো রিপোর্ট কার্ড নাওনি? ধরে নাও, এটাও সে রকমই একটা কিছু।’ শুনে হেসে ফেললাম। পরিস্থিতিটাও একটু সহজ হয়ে এল। আয়মান সাদিক কীভাবে টেন মিনিট স্কুলের মাধ্যমে হাজার হাজার কিশোর-তরুণকে অনুপ্রাণিত করে, কিছুটা আঁচ করতে পারলাম।

অবশেষে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মুখোমুখি হলাম। তিনি আমার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলেন, অভিনন্দন জানালেন। হাতে তুলে দিলেন ইয়াং লিডারের পদক। আমার জন্য তখনো একটা চমক বাকি ছিল। সবাই একসঙ্গে ছবি তোলার সময় আবিষ্কার করলাম, আমার আসনটা ঠিক রানির পাশে!

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর আমি আর আয়মান গেলাম ডেভিড বেকহামের কাছে। সম্ভবত পদক হাতে পাওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছিল! আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বললাম, ছবি তুললাম। আয়মান এই সুযোগে জানিয়ে দিল, বাংলাদেশে বেকহামের অনেক ভক্ত আছে।

সে রাতে হোটেলে ফেরার পর আমার আর ঘুম আসছিল না। ফোনে তোলা ছবিগুলো বারবার দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, এসব তাহলে সত্যি! স্বপ্ন নয়!

আমি যখন ফেমের কাজ শুরু করি, এমন কিছু অর্জনের ভাবনা আমার সুদূর কল্পনাতেও ছিল না। আজ এসব লিখতে বসে মনে হচ্ছে, আমি একটা গল্প বলছি। একেবারেই কাল্পনিক একটা গল্প। তবে এই গল্পই আমাকে সামনে এগোনোর, আরও বড় স্বপ্ন দেখার শক্তি জোগাবে।