May 24, 2019

কার্টুন বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে যে শিল্প

https://archive1.ittefaq.com.bd/print-edition/projonmo/2018/10/01/303912.html
 
বিশ্বজুড়ে কার্টুনশিল্প খুব জনপ্রিয়। পত্রিকা কিংবা কমিক বুকের পাতা রঙিন করে রাখা কার্টুন পছন্দ করেন সববয়সী মানুষ। বাংলাদেশেও কার্টুনিস্টরা সমকালীন বিষয়সহ বিভিন্ন ভাবনা ফুটিয়ে তোলেন তাদের আঁকা কার্টুনের মাধ্যমে। ‘প্রজন্ম’-এর এবারের আয়োজনে আমরা সরাসরি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি কার্টুনশিল্প প্রসঙ্গে। সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার, গ্রন্থনায় সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার, ছাইফুল ইসলাম মাছুম ও জাহিদ হাসান দীপু
 
‘কার্টুন হলো মিনিমাম আর্ট,
 
এতে কম এঁকে বেশি প্রকাশ করা যায়’
 
—আহসান হাবিব
 
জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট, সম্পাদক উম্মাদ
 
 
 
যেকোনো সাধারণ ড্রইং হলো একটি ইলাস্ট্রেশন। আর কার্টুনচিত্রের মানে হলো হিউমারের ভিতর থেকে একটি মেসেজ দেওয়া। কার্টুনচিত্রের সাথে সাধারণ ড্রইংয়ের পার্থক্য এখানেই। বিশ্বজুড়ে ‘কার্টুনিস্ট’ একটি স্বীকৃত পেশা। একইসাথে এটি মর্যাদাপূর্ণ, কারণ পত্রপত্রিকায় একজন কার্টুনিস্ট সহকারী সম্পাদকের পদমর্যাদায় কাজ করেন। কার্টুনিস্টরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে বিভিন্ন সমস্যাকে  তুলে ধরেন মজার ছলে, যেটা সবাইকে আকৃষ্ট করে এবং সবাই সহজে মনে রাখে। ছোট একটি কার্টুনই শক্তিশালী হয়ে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে।
 
এমন অনেক ঘটনার মধ্যে একটি আমরা দেখেছি, ভারতের একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, যাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে যত কার্টুন করা হতো সব তিনি তার অফিসে পিনআপ করে ঝুলিয়ে রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘আমি আমাকে নিয়ে আঁকা এই কার্টুনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে থাকি এবং সে অনুযায়ী নিজেকে
 
পরিচালনা করি।’
 
একজন কার্টুনিস্ট যখন দেশের রাজনীতি বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়কে উদ্দেশ্য করে কার্টুন আঁকেন, তখন তার কাজটা খুব সহজ হয় না। আঁকার সময় সচেতনতার সাথে অনেক কিছু ভাবতে হয়, গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়। কারণ বিষয়টি এমন যে, কার্টুনটির ধরন এমন হতে হবে যা মানুষকে আনন্দ দেবে, মেসেজ পৌঁছে দেবে, আবার তাতে হিউমারও ঠিকমতো থাকতে হবে। সবকিছুর সমন্বয়েই একটি কার্টুন তৈরি হয়।
 
এখনকার সময়ে মানুষ বেশি পড়তে চায় না। বড় বড় লেখা এড়িয়ে যায়। সেক্ষেত্রে দু-তিনটা কার্টুনের মাধ্যমে কোনো একটি বিষয়কে খুব সহজে তুলে ধরা যায়। তাই কার্টুন হলো মিনিমাম আর্ট, যার মাধ্যমে কম ছবি এঁকে একটি সমস্যা বা বিষয়কে প্রকাশ করা যায়। উদ্দেশ্য থাকে যে, যাকে নিয়ে কার্টুন আঁকা হয়েছে, সেই ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ যেন নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং এর থেকে মজা পান। কিন্তু কেউ যদি কোনো কার্টুন দেখে রেগে যান, তবে সেটা কার্টুন হলো না। এমনও হয়, কার্টুন দেখে রেগে গিয়ে কেউ কার্টুনিস্টের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। সুতরাং সার্বিক বিষয়কে মাথায় রেখে কাজ করতে হয়, তাই কার্টুনশিল্প একটি ভিন্নধরনের আর্ট।
 
একজন ভালো কার্টুনিস্টের লক্ষ্য হলো কার্টুন আঁকার সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে কমিকস আঁকা। এরসঙ্গে এখন আরও যুক্ত হয়েছে গ্রাফিক্স। এটি কমিকসের পরের ধাপ। শুধু কালো কালির ছাপার অক্ষর পড়ার প্রবণতা কমে গেছে মানুষের মাঝে, মানুষ এখন গ্রাফিক্স দেখে আকর্ষিত হয়ে সেদিকে বেশি ঝুঁকছে। তাই এখন ক্লাসিক বিষয়গুলোতেও গ্রাফিক্সের ব্যবহার যুক্ত হচ্ছে। দেশ-বিদেশে সব জায়গায় এখন পাঠকের আগ্রহ ফেরাতে বইয়ের ভিতরেও গ্রাফিক্স ব্যবহূত হচ্ছে। যারা কার্টুনশিল্পের সাথে জড়িত, তারা যে স্রেফ পত্রিকার জন্যই কার্টুন আঁকেন—বিষয়টি এমন না। এই সবগুলো বিষয়ে কাজ করেই কার্টুনিস্ট হওয়াকে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়। কার্টুনিস্টদের কাজের সুযোগ ও পরিধি দিনদিন আরও বিস্তৃত হওয়ায় উপার্জনও বাড়ছে। আবার কার্টুনিস্টদের কেউ কেউ দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন করছেন। ভবিষ্যতের জন্য এটা ভালো প্লাটফর্ম।
 
বিদেশি বিভিন্ন কমিকস আমাদের দেশে বহু আগে থেকে প্রচলিত থাকলেও দেশে সেভাবে কমিকস তৈরি হচ্ছিল না। কিন্তু বর্তমানে নতুন অনেক কাজ হচ্ছে, কালার কমিকস তৈরি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘ঢাকা কমিকস’ নামের প্রতিষ্ঠানটি বেশকিছু থ্রিলার ও সায়েন্স ফিকশন কমিকস বাজারে এনেছে, যা এরমধ্যেই অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। নিশ্চয়ই এভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের কমিকসও অনেক দূর এগিয়ে যাবে, এগোবে কার্টুনশিল্প।
 
 
 
‘সামাজিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে কার্টুন স্ট্রং মেসেঞ্জার হিসেবে কাজ করে’
 
—শাহরিয়ার খান
 
কার্টুনিস্ট ও কমিক লেখক
 
 
 
সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আলাদা একটি বিষয় হলো এডিটরিয়াল কার্টুন। এই কার্টুনের মাধ্যমে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক মত প্রকাশ করা। কিন্তু বর্তমানে সেটাও ভালো অবস্থানে নেই। এক হলো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক নেতারা কার্টুন দেখে রিঅ্যাক্ট করছেন। এ পরিস্থিতি থেকে বলতে হবে আমরা একটা জায়গায় উঠে আবার সাইড ডাউন করেছি। প্রায় সব পত্রিকায় কার্টুন প্রকাশ করা হয়, তবে সব সম্পাদক সেটা পছন্দ করেন না। সে অর্থে প্রতিযোগিতার খাতিরেই সবাই কার্টুন প্রকাশ করছে। এ কারণে পত্রিকাগুলোতে কার্টুনিস্টদেরও চাকরির সুযোগ বাড়ছে, যেটা আগে ছিল না। তখন টাকার চাহিদাও কম ছিল। একসময় প্রখ্যাত শিল্পী রনবী অনেক কার্টুন এঁকেছেন, তবে তা পেশাগত পর্যায়ে ছিল না। ‘উন্মাদ’-এর মতো রম্যপত্রিকা এসে দেশে কার্টুনশিল্পকে ব্যতিক্রমী পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখন কার্টুনশিল্পকে পেশা হিসেবে নিয়ে পত্রপত্রিকায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার অবস্থা তৈরি হয়েছে। কার্টুন আঁকার দ্বিতীয় ধাপ হলো কমিকস। এই বিষয়টা কিছুটা আলাদা। দেশে এখন অনেক কার্টুনিস্ট তৈরি হলেও কমিক আঁকার পাশাপাশি লিখবে এমন মানুষ খুব বেশি তৈরি হয়নি। মোটাদাগে বলতে গেলে, আমরা যেভাবে বিদেশি কমিকসগুলো পড়তাম, সেসবের চরিত্র দেখে আকর্ষণ অনুভব করতাম, সেধরনের কাজ এখনো আমাদের দেশে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে একটা কমিকস পাবলিকেশন হাউস কমিকস বিক্রি করে যে পরিমাণ আয় করে, আমাদেরকে সে অবস্থানে যেতে অনেক সময় লাগবে। তবে আশার কথা হলো, এখন কাজ হচ্ছে। ঢাকা কমিকস নামের প্রতিষ্ঠানটি বেশকিছু কমিকস বাজারে এনেছে, এগুলোর ডিমান্ড তৈরি হয়েছে, কিন্তু এখনো ‘লং ওয়ে টু গো’। সামাজিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে কার্টুন স্ট্রং মেসেঞ্জার হিসেবে কাজ করে। আমি আমার কমিক চরিত্র বেসিক আলীর মাধ্যমে মানুষকে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করেছি, তেমনি ‘লাইলী’র মাধ্যমে মেয়েদেরকে ‘স্ট্রং’ দেখাতে চেয়েছি। সচেতনতার বিষয়টা যে সবসময় সরাসরি হতে হবে তা নয়, এটা অবচেতনভাবেও হতে পারে। একটা গল্পের ভিতর বন্ধুত্ব, মনুষ্যত্ব, নিষ্ঠা, সত্যবাদিতা এগুলো আসতে পারে। এগুলো ছোটদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সবশেষে বলব, প্রচুর পাঠক আছেন, যারা ভালো জিনিস পড়তে চান। সে তুলনায় নতুন কার্টুনিস্ট বা কমিকস রাইটারের সংখ্যা খুব কম। সুতরাং কাজের অনেক সুযোগ আছে, দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করলে ভালো কিছু করা সম্ভব।
 
 
 
‘কার্টুন শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটায়’
 
—মোর্শেদ মিশু
 
কার্টুনিস্ট
 
 
 
একজন কার্টুনিস্টের জায়গা থেকে বলতে গেলে, কার্টুন আঁকা ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবেই নিজস্ব ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। আর কার্টুন যে সমাজ সংস্কারের জন্যই আঁকতে হবে কিংবা মুহূর্তেই তা সমাজকে পরিবর্তন করে ফেলবে, এমনটা ভাবা বাধ্যতামূলকও না। তবে শুধু কার্টুন না, সব ধরনের ফর্ম অব আর্টই (শিল্পকর্ম) সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখে, সেটা হতে পারে ছবি, সিনেমা, কার্টুন কিংবা চিত্রকর্ম। শিশুরা তাই শেখে বা হয়ে ওঠে, যা তারা দেখে দেখে বড় হয়। একটা শিশু ছোট থেকে বেড়ে ওঠে কার্টুন দেখতে দেখতেই। আর চিন্তার বয়স হলেই সে শুরু করে ছোট থেকে দেখে আসা জিনিসগুলোর সাথে মিলিয়ে নিতে। এভাবেই তার মানসিক বিকাশ ঘটে। আর সে তেমন মানুষই হয়ে উঠবে, যেমনটা আমরা ছোট থেকে তার সামনে উপস্থাপন করব। ভবিষ্যত্ ভাবনার কথা বলতে গেলে, আমাদের গ্রুপ ‘কার্টুন পিপল’-এর পক্ষ থেকে শীঘ্রই যারা নিয়মিত কার্টুন আঁকেন বা শখের বসে আঁকেন, তাদের আঁকা কার্টুন নিয়ে একটি বই প্রকাশের চিন্তা করছি। এর পাশাপাশি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিতভাবেই কার্টুন অঙ্কন বিষয়ক টিউটোরিয়াল আপলোড করা হয়ে থাকে। তাছাড়া সামনে ‘কার্টুন পিপল’-এর ২য় বর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে একটি প্রদর্শনী করার কথা ভাবছি। আর কর্মক্ষেত্রে সমস্যা কিংবা প্রতিবন্ধকতার কোনো শেষ নেই, সেটা যে প্রফেশনই হোক না কেন। তবে একাগ্রচিত্তে লেগে থাকাটাই এর সবচেয়ে বড় সমাধান। অন্যদিকে মানুষের ভালোবাসা, ভালো লাগা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়, যার সামনে বাধা-বিপত্তি কিংবা প্রতিবন্ধকতা আসলে কিছুই না।
 
 
 
‘একটি কার্টুন পুরো এক মলাটে পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ তুলে ধরে’
 
 
 
—জুনায়েদ আজিম চৌধুরী, কার্টুনিস্ট
 
 
 
দেশে বিভিন্ন সময়ে সৃষ্টি হওয়া সামাজিক অস্থিরতার দিনগুলোতে একটা শক্তিশালী স্লোগান যেমন মাঝে মাঝে বিশাল গণজাগরণে নেতৃত্ব দেয়, তেমনি কার্টুনিস্টদের করা কোনো কার্টুন তার চেয়েও ইফেক্টিভলি দেশের এবং দেশের বাইরের মানুষদের কাছে এক মলাটে পুরো পরিস্থিতিটার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে। একটা ছোট্ট কার্টুন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পুরো পরিস্থিতিটা। আমাদের দেশে কার্টুনিস্টদের কিছুটা প্রতিকূলতা আছে, যেকোনো ইস্যুতে কার্টুন আঁকার জন্য পুরোপুরি স্বাধীনতা না পেলেও একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা পর্যন্ত স্বাধীনতা আছে। তবে মন খারাপ করার মতো বিষয় হলো অনেকে কোলাজ (যেগুলো বিভিন্ন গ্রাফিক্স এডিট সফটওয়্যারে আসল ছবিকে এডিট করে করা হয়) আর কার্টুনকে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এক করে ফেলেন। আশার কথা এই যে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রপত্রিকা বিভিন্ন ইস্যুতে ছবি বা কোলাজের চেয়ে কার্টুন দিয়ে জিনিসটা একঝলকে বুঝিয়ে দেওয়ার চর্চা করছে, যা দেশের কার্টুনশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য খুবই ইতিবাচক। প্রতিটা মানুষ নিজের যুক্তির সাথে তার দেখা কার্টুনটা মেলাতে চেষ্টা করে। যখন কেউ একটা কার্টুনে তার ভাবনার প্রতিচ্ছবিটা গোছানো অবস্থায় মেলাতে সক্ষম হয় তখনই সে সেই কার্টুন দ্বারা প্রভাবিত হয়, যা তার ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে। একটা বিষয় নিয়ে কার্টুন আঁকার সময় কার্টুনিস্টদেরকে পুরো বিষয়টা নিয়ে পরিষ্কার জ্ঞান রাখতে হয়। তারপর মানুষ কীভাবে ভাবছে সেটা ভেবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সমন্বয় করেই কার্টুন তৈরি হয়। ভালো কার্টুন ছাপার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত মাধ্যম সবখানেই প্রশংসা কুড়ায়। শেয়ার, দেশি-বিদেশি ওয়েবসাইট, ওয়েব পোর্টালের হাত ধরে ছড়িয়ে যায় লক্ষ মানুষের কাছে। অপরিচিত কারোর মুখে নিজের কার্টুনের প্রশংসা শোনার অনুভূতি লিখে প্রকাশ করা যাবে না। এখন অনেকেই বড় হয়ে প্রফেশনাল কার্টুনিস্ট হতে চায়। আমাদের দেশে নতুন তৈরি হওয়া কমিকসগুলোও আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠছে কিছু নিরলস পুরোনো ও নতুন কার্টুনিস্টদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। যারা নতুন কার্টুনিস্ট, তারা যদি মন থেকে কাজটা করে তবে এটি হবে দেশের অন্যান্য পেশার মতোই একটি সম্মানজনক পেশা।
 
 
 
‘কার্টুন একটি শক্তিশালী মাধ্যম’
 
—শাহানারা নারগিস শিখা, কার্টুনিস্ট
 
 
 
কার্টুন শব্দটি এসেছে ইতালিয়ান ‘কার্টন’ থেকে যার অর্থ শক্ত মোটা কাগজ। আর কার্টুন হলো একধরনের অঙ্কন যার মাধ্যমে কোনো একটি বিষয়কে হাস্যকর, অতিরঞ্জিত ও বিদ্রুপাত্মকভাবে উপস্থাপন করা যায়। আমাদের মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ ভিজুয়াল প্রসেসিংয়ের কাজে করে, যা আমাদের চেতনা ও মনোযোগ দুইয়ের ভিতর অবস্থান করে। সামাজিক যেকোনো প্রেক্ষাপটে সচেতনতা তৈরিতে ছবি লেখার চেয়ে ১০ গুণ বেশি গৃহীত হয়। আবার অনেক বড় কোনো সমস্যা তুলে ধরতে কার্টুন অল্প একটু জায়গাতে পুরো বিষয়টাকে উপস্থাপন করতে পারে। একইভাবে এটি কাজ করে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। সমাজের যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচার-কুসংস্কার বা ভুল ধারণার বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে  পারে। একজন কার্টুনিস্ট তার আঁকা কার্টুন দিয়ে অনেক অল্প সময়ের মধ্যে কাজটি সহজেই করতে পারেন। যেমন উদাহরণ হিসেবে ইউনিসেফের ‘মীনা’র কথা বলা যায়। এই কার্টুনটি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। আমি নিতান্ত শখের বশেই কার্টুন আঁকা শুরু করি। যখন শুরু করি তখন এখনকার মতো কার্টুনের খুব সুযোগ ও জায়গা ছিল না। পত্রপত্রিকার ফান সাপ্লিমেন্টে কার্টুন প্রকাশ হতো। ‘উন্মাদ’-এ যখন প্রথম মেয়ে কার্টুনিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করলাম, তখন আহ্সান হাবীব ভাইয়া খুব উত্সাহ দেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় এখনো কাজ করছি। তবে যেহেতু রাজনীতি-অর্থনীতিসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়েও কার্টুনিস্টরা কাজ করেন, তাই অনেকসময় বিভিন্ন বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়, কিন্তু সাহস নিয়ে কাজ করতে হয়। পাঠকরাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কাজের মূল্যায়ন তারাই করেন। সামনাসামনি দেখা হলেও অনেকে কার্টুন এঁকে দেওয়ার জন্য বায়না করেন, এটিও অনুপ্রেরণা যোগায়। কোনো বিষয়ে কার্টুন আঁকার সময় প্রথমেই ভাবতে হয় সেখানে কী মেসেজ দিতে হবে, সে অনুযায়ী ক্যারেক্টারও তৈরি করতে হয়। এখন সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। অদূর ভবিষ্যতে আমি নিজে কমিকস তৈরির কাজ শুরু করতে চাই। পরিশেষে বলব, ভালো কার্টুন এঁকে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রেখে সুন্দর দেশ গড়ার জন্য কাজ করতে হবে।
 
 
 
‘সামাজিক অসংগতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যম কার্টুন’
 
 
 
—সাদাত আহমেদ, কার্টুনিস্ট
 
 
 
কার্টুন হলো একইসঙ্গে মজার ও আক্রমণাত্মক একটা মাধ্যম। ভিজুয়াল কমিউনিকেশনের একটা শক্তিশালী শাখা হলো এই কার্টুন। অনেক না বলা কথা কিংবা হাজার শব্দে যা হয়তো বোঝানো যায় না, তাই হয়তো এক ফ্রেমের কার্টুন বলে দিতে পারে। ভিজুয়াল কমিউনিকেশনের মজার ব্যাপার হলো এর নিজস্ব একটা ভাষা আছে। যে কারণে প্রচলিত ভাষাগত বাধা এড়িয়ে সব মানুষই কার্টুন বুঝতে পারে। এমনকি একজন নিরক্ষর মানুষও একটা কার্টুনের মাধ্যমে সমাজের একটা চিত্র দেখতে পায়। বিপুল এই গ্রহণযোগ্যতাই আমাকে কার্টুন আঁকতে অনুপ্রাণিত করে। কার্টুনের অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। যেমন রাজনৈতিক কার্টুন, স্যাটায়ার, কমিকস স্ট্রিপ, পকেট কার্টুন ইত্যাদি। আমার ভালো লাগে সাম্প্রতিক সময়টাকে কার্টুনে ধারণ করতে। কখনো সেটা রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক, কখনোবা সামাজিক কিংবা খেলাধুলা। আমার মনে হয় যুগে যুগে শিল্প ও শিল্পী সৃষ্টির মাঝে একজন শিল্পীর মূল কাজ তার সময়কে ধারণ করা। তার সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেই পরবর্তী ধাপে নিজেকে বা সমাজকে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা। সে কারণেই আমি চেষ্টা করি আমার সময়কে কার্টুনে ধারণ করতে। আমার কার্টুন গড়ে ওঠে সংবাদের ওপর ভিত্তি করে। আমার চেষ্টা থাকে যৌক্তিক সমালোচক হওয়ার এবং রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক অসংগতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার। দেশ ও সমাজের সাধারণ মানুষের একজন হয়ে সাধারণ মানুষের প্ররিপ্রেক্ষিত থেকে চারপাশকে দেখা এবং যা বলা বা হওয়া উচিত তার পক্ষে একে যাওয়া। একটা বিষয় সবসময় মাথায় রাখার চেষ্টা করি সেটা হলো দেশ, দেশের মানুষ, গর্ব করার ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সার্বভৌমত্ব ও সর্বোপরি মানবতাবোধের পক্ষে অবস্থান নিতে। কার্টুনকে আমি আলাদা ভাষা হিসেবে দেখি। তাই চেষ্টা করি কার্টুনে অন্য কোনো ভাষার (বাংলা বা ইংরেজি) ব্যবহার না করতে। শুধুমাত্র ভিজুয়ালি কানেক্ট করার চেষ্টা করি। এতে সমাজের সকল স্তরে পৌঁছানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষাগত বেড়াজাল টপকিয়ে আমার বক্তব্য প্রকাশ করতে পারি। সব মানুষের বুকের ভিতর জমে থাকে দিনবদলের স্বপ্ন-আশা। কেউ প্রকাশ করার সুযোগ পায়, কেউ বা পায় না। আমি প্রকাশ করি কার্টুন এঁকে। কার্টুন আমার প্রতিবাদের ভাষা।
 
 
 
‘কার্টুন অ্যানিমেশনের ওপর কাজ
 
করার ইচ্ছে আছে’
 
 
 
—সামিন ফারহান
 
কার্টুনিস্ট
 
 
 
ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার শখ ছিল। নিজের মতো করে ছবি আঁকতাম, রং করতাম। তবে এর কিছুই কার্টুন ছিল না। কার্টুন আঁকার শখ বা ইচ্ছাটা জাগে আসলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে ‘কার্টুন পিপল’-কে দেখে। ‘কার্টুন পিপল’-এর সবাইকে দেখতাম একসাথে আড্ডা দিতে, ছবি আঁকতে, আর নিজেদের কাজ পরস্পরের সাথে শেয়ার করতে। সেখান থেকে কার্টুন আঁকার প্রেরণা আসে। আর সেই থেকেই আমার কার্টুন আঁকা শুরু। এখন কার্টুনটা আঁকি আমার ভালো লাগার আর ভালোবাসার জায়গা থেকে। খুব বড় কিছু হতে না পারলেও শুরুর দিক থেকে কিছুটা ভালো জায়গায় আছি। বর্তমানে আমি ‘কার্টুন পিপল’-এর সাথে যুক্ত আছি। পাশাপাশি ‘বুম্যারাং ডিজিটাল’-এর সাথেও যুক্ত আছি। খুব বড় কিছু হতে না পারলেও শুরুর দিক থেকে কিছুটা ভালো জায়গায় আছি। তবে ইলাস্ট্রেটর হিসেবে আমাকে সবসময়ই কোনো না কোনোভাবে কার্টুন আঁকতেই হয়। শুধু কার্টুন আঁকাকে পেশা হিসেবে নেওয়া আমার কাছে এখনো সময়ের ব্যাপার হলেও অসম্ভব কিছু না। নিয়মিত কাজ করে গেলে এই সেক্টরকেও পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভব।
 
আমার মতে, সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কার্টুনের ভূমিকা অনেক বেশি। বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে কার্টুন আঁকা প্রচলন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বছর আগ থেকে চলে আসছে। আর এর পিছনের মূল কারণ, মানুষের কাছে লিখিত দলিল থেকে ছবি কিংবা সিনেমা অনেক বেশি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই কার্টুন কিংবা স্থিরচিত্র কিংবা চলচ্চিত্র মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে। আর সঙ্গত কারণেই তা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর ভবিষ্যতে কার্টুন অ্যানিমেশনের ওপর কাজ করার ইচ্ছাটা অনেক বেশি। কার্টুনের এই ধরন হিসেবে বাংলাদেশে কিছুদিন আগে ‘মন্টু মিয়ার অভিযান’ শুরু হলেও তা বেশিদিন টিকেনি। বর্তমানে সবাই প্রিন্ট মিডিয়া কিংবা কমিকস বইয়ের কার্টুনের ওপর কাজ করছে। তবে আমি অ্যানিমেটেড ফর্মটাকে নিয়ে কাজ করতে চাই।