আচ্ছা, স্কুল জীবনের ক্লাস ওয়ান থেকে একেবারে এইচএসসি পর্যন্ত এমন একটা পাঠ্য বিষয়ের নাম বলুন যা প্রতিটি ক্লাসেই অনিবার্যভাবে ছিলো।

আচ্ছা একটু ভাবুন না হয়। ভেবে ভেবে কি বলবেন অবশেষে, বলি? “আরে এটা তো সহজ, বাংলা বইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলামের একটা কবিতা আর একটা গল্প”

হ্যা, ছোটোবেলা থেকেই আমরা একটু একটু বড় হয়েছি এই দুই প্রিয় কবির লেখা পড়ে পড়ে। আজকে রবি ঠাকুর থাকুক বরং আজকে একটু কথা বলি ঠিক দুইদিন আগে যারা ১২০ তম জন্মছিলো ছিলো।সবার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, আমাদের দুখু মিঞা।

শৈশবের একেবারে গোড়ায় ছবিওয়ালা ছড়ার বইতে পড়া সেই লিচুচোর থেকে শুরু। এরপর “ভোর হলো দোর খোলো”, “ঝিঙে ফুল ঝিঙে ফুল”,” আমি হবো সকাল বেলার পাখি” আর কত রঙিন, সরল ,শিশুতোষ কবিতায় ভরপুর ছিলো আমাদের ক্লাস থ্রি, ফোর, ফাইভের বই আর আমাদের সরল মন। আচ্ছা একটু ভাবি তো এই কবিতা গুলো শুধুই কবিতা পড়ার জন্যেই ছিলো? ছোটো ক্লাসে আমরা পরীক্ষায় কবিতার আট লাইন মুখস্থ লিখে দিয়ে আসতাম । এরপর ? এরপর কি, নতুন বছরের নতুন বই, নতুন কবিতা।

আসুন একটু অন্য ভাবে ভাবি। এই কবিতা গুলো আমাদের পাঠ্য বইয়ে কি ছিলো না আমাদের শিশু মনে আস্তে আস্তে সরল, দায়িত্বপূর্ন এবং সুষ্ঠু একটা সত্ত্বার বীজ বুনে দেয়ার জন্য ? আমরা জানবোই না , বুঝবোও না কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের মাঝেই গড়ে উঠবে একজন নাগরিক ? একজন জাতি, ধর্ম, বর্ণের পরোয়া না করা অসাম্প্রদিক নাগরিক?

আচ্ছা বিশ্বাস হয় না ?

তাহলে এই লাইনটা একটু পড়ে ভেবে দেখুন, ” আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?”

এ সকাল নিশ্চয়ই রোজকার সকাল, সুর্যোদয়কে ছাপিয়ে সেই সকাল বা উষার আহবান যা পরাধীন ভারতবর্ষের সকল নাগরিকরে একবার করে ডাক দিয়ে গেছে, “জেগো উঠো, মাথা তুলো, তুমি যদি না জাগো তাহলে কিভাবে এদেশ স্বাধীন হবে।”

মা ও খোকার মধ্যে এই কাল্পনিক সাধারণ কথাবার্তা এবার আপনার রোজকার জীবনে যেকোনো অন্যায়, অবিচার, শোষণের দৃশ্যে যখন চুপ করে থাকেন তাতে মেলান আর ভাবেন ” আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?”

নজরুলের জীবন, নজরুলের কাজের ব্যপ্তিই এমন। গত শতাব্দীর ত্রিশ দশকের পরাধীন, অশান্ত ভারতবর্ষে যেখানে ধর্মে ধর্মে রেষারেষি, মানুষে মানুষে বিভেদ অশান্ত সেই দেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল, শিক্ষিত সমাজের মাঝে দাঁড়িয়ে নজরুল বারবার গেয়েছেন সাম্যের গান। খুব সহজ তার আদর্শ। হিন্দু-মুসলিমের সমতার আদর্শ, সহিষ্ণুতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশের আদর্শ।
তার কবিতার তেজস্বী ভাষায় তাই জ্বলন্ত দাবানলের মতো উঠে এসেছে একই আহবান,

“হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোনজন,
কান্ডারী আজ বুঝিবো তোমার মাতৃ মুক্তিপণ”

দ্রোহের কবি নজরুল আবার বিপরীতভাবে প্রেমের কবি নজরুল। যেখানে সমাজের নানা অনাচারের বিরুদ্ধে তুলতে চেয়েছেন আগুনের ঝান্ডা। পারতপক্ষে দারিদ্রতা আর অসহায়ের জন্য ফেলেছেন চোখের জন্য। কলমের ভাষায় নিবেদন করেছেন বেদনা।

“এই যে মায়ের অনাদরে ক্লিষ্ট শিশুগুলি,
পরনে নাই ছেড়া কাপড়, সারা গায়ে ধুলি”

লিখেছেন প্রেমের গান, বিরহের কবিতা। অতি অল্পসময়ের সাহিত্য সাধনায় তার এই বহুমুখি পদচারণ অবাক করে সবাইকে। কিভাবে সম্ভব ?

নজরুলের সাহিত্যে আমরা যতটা খুঁজে পাই Positive Bangladesh গড়ার প্রেরনা। ততোটাই খুঁজে পাই তার বিষ্ময়কর জীবনের অভিজ্ঞতার অবতারনা করে। উঠে এসেছেন দারিদ্রতার কঠিন বাস্তবতা থেকে, ঘুরে বেড়িয়েছেন, লেটোর গান গেয়েছে, রুটির দোকানে কাজ করেছেন, করেছেন লেখাপড়া, স্কুল পালিয়েছেন, যুদ্ধে গিয়েছেন। হ্যা, অনেক অভিজ্ঞতা তার একজীবনে। তবে দরিদ্র ইমামের ছেলে দুখু কোনোদিন লড়াই থামান নি। যেটা ভালো পারেন সেটা করার লড়াই । যে সহজাত লেখালেখির প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন এই কঠিন পৃথিবীতে। দারিদ্রতার কঠিন বাস্তবতা থামিয়ে দিতে পারে নি নজরুলের সেই মননশীলতার চর্চা।

সহজাত প্রতিভা, নিরন্তন চেষ্টা আর একটি শান্তিময় অসাম্প্রদায়িক পৃথিবী গড়বার দুর্বার সরল স্বপ্ন গড়ে দেয় নজরুলকে সেই মহান ব্যক্তি হবার সোপান যার সবচেয়ে উঁচু পদে আসীন হয়ে আজ তিনি আমাদের জাতীয় কবি।

কয়েকদিন আগেই চলে যাওয়া প্রিয় কবির ১২০ তম জন্মদিনে পজিটিভ বাংলাদেশ তার অবস্মরনীয় সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি স্মরণ করছে তার আদর্শ ও নীতি কে যার অনুসরণ আমাদের পজিটিভ বাংলাদেশ গড়ার অনুপ্রেরণা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

– লিখেছেন Mohammad Sifat

#KaziNazrulIslam #Day1 #100DaysOfPositivity#SpreadPositivity #PositiveBangladesh