“দিনক্ষণ হিসেব করে বলতে পারবনা ঠিক কবে থেকে ট্রাভেল করার ভুতটা মাথায় চাপল! তাতে লাভ ক্ষতি কি হয়েছে জানিনা তবে দুনিয়া দেখার নেশাটা এতো বছরের শিক্ষা আর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে। সেইসাথে আমার ব্যক্তিত্ব নির্মাণে “ট্র্যাভেল” গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে । ১৯৯৯ সাল থেকে অর্থাৎ প্রায় ২০ বছর ধরে পৃথিবীর ৪৬টি দেশ ঘুরতে ঘুরতে মনে হল নিজের দেশটাও ঘুরে দেখি । বিশেষকরে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী- প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা গুলো ঘুরতে গিয়ে আবারো মনে হয়েছে , গর্ব করার মত নানা বৈচিত্রে ভরপুর এক সমৃদ্ধ জনপদ ‘বাংলাদেশ’। এ যাবত ৪৯টি জেলার ঐতিহ্যের স্থাপনা ঘুরে মনে হয়েছে ভাঙ্গা ইটের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখি। ২০১৬ সালে মে মাসে শুরু হয় এই “হেরিটেজ জার্নি” যার নাম দিয়েছি QUEST। ২০১৬ সালের পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেন দিয়ে শুরু হয় QUEST এর যাত্রা। 

আমার কাছে QUEST স্রেফ ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং QUEST মানে ইতিহাস, প্রেরনা ঐতিহ্য,শক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, আত্মপরিচয়, আর শেকড়ের সন্ধানে এক বিনির্মাণের যাত্রা। ৪০ এর চৌকাঠ পেরুনো এক নারীর নতুন উপলব্ধির যাত্রা ।দেখার পাশাপাশি, লেখার পাশাপাশি, ছবি তুলে, ভিডিও করে ডকুমেন্টস সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলে ধরছি। 

সারা বিশ্বে পর্যটন একটি সম্ভনাময় শিল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে । ট্যুরিজমের অনেক গুলো শাখা আছে যেমন – এডুকেশন ট্যুরিজম , ব্যবসা ট্যুরিজম, এডভেঞ্চার ট্যুরিজম , হেরিটেজ ট্যুরিজম ইত্যাদি। পৃথিবীর উন্নত দেশ গুলো , এমনকি উন্নয়নশীল দেশ গুলো পর্যটনের বিভিন্ন শাখা গুলো নিয়ে কাজ করছে এবং বিপুল পরিমান বিদেশি মুদ্রা অর্জন করছে যা একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিচ্ছে। 

পর্যটনের এই শাখা গুলোর মধ্যে সব থেকে গুরুত্তপুর্ন হল হেরিটেজ টুরিজম। সব দেশ তাদের ইতিহাস ঐতিয্য তুলে ধরে আকর্ষণ করছে কোটি কোটি পর্যটকদের নিজের দেশে । আমাদের পাশের দেশ ভারত , নেপাল , লাওস , কম্বোডিয়ার মত দেশও তাদের দেশে হেরিটেজ ট্যুরিজমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনছে। 

আমি চাই দেশের মানুষ ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে আরো সচেতন হবে। বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের সমৃদ্ধ জনপদ সম্পর্কে জানবে এবং তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবে। সেইসাথে প্রত্নতাত্তিক পর্যটন বা হেরিটেজ টুরিজম বানিজ্যিকভাবে পরিচালিত হলে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে তৈরী হবে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। হেরিটেজ ট্যুরিজমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল হবে। 

২০ বছরের বিশ্ব ভ্রমনের যাত্রায় আমার নিজেকে সত্যিকার ট্রাভেলার মনে হয়েছে যখন আমি বাংলাদেশের কোনায় কোনায় গেছি। আমার দেশের সংস্কৃতি ,ইতিহাস , ঐতিয্য , মানুষ আমাকে যা আনন্দ দিয়েছে পৃথিবীর বড় বড় দেশ তা দিতে পারে নি। আমি দেখেছি গর্ব করার মত বিশ্ব মানের স্থাপনা আমাদেরও রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সংরক্ষণ , রক্ষনা-বেক্ষন ও প্রচার প্রসারনা। 

অনেক পজিটিভ সাড়া পাচ্ছি মানুষের। সেই প্রেরনাতেই শহর থেকে শহরে ছুটে বেরাচ্ছি। যখন কেউ বলে “ আপু আপনাকে দেখে সাহস পাই নতুন কিছু করার। আবার যখন কেউ ফোনে বলে “আপু আপনাকে সামনে থেকে দেখতে চাই“। বিভিন্ন দেশ থেকে (আমেরিকা , মালেয়শিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া) প্রবাসীরা যখন ফোন করে দোয়া দেয় তখন অকারনেই চোখ ভিজে যায় আর ছুটে চলার দ্বিগুণ অনুপ্রেরনা পাই। তারা ধন্যবাদ জানায় তাদের জেলাকে সবার সামনে উপ্সথাপন করার জন্য। 

এমন কিছু স্থাপনার তথ্য আমি পেয়েছি যা লোকচক্ষুর অন্তরালে আছে । এমনকি সেই জেলার গন্য মান্য ব্যক্তিরা সেই স্থাপনা সম্পর্কে অয়াকিবহল নন । সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায়ে তুলে ধরবার পরও একই ধরনের ফিডব্যাক পেয়েছি “ আল্লাহ আপু এটা আমার জেলায় আমি জানি না “ । উদাহরন সরুপ – ঠাকুরগাঁ জেলার গোরকুই কুপ (যা বাংলাদেশের একমাত্র বেলে পাথরের কূপ) , নওগাঁ জেলায় জগদ্দল বিহার , দিনাজপুরের সীতাকোট বিহার ( সেটি খনন করেছেন আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া ) , পঞ্চগড়ের ভিতর গড় ( বাংলাদেশের একমাত্র দুর্গ নগরী ) , গাইবান্ধা জেলার প্রাচীন বোগদহ বিহার, জয়পুরহাট পাথরঘাটা প্রাচীন নগরী, নওগাঁ জেলার দিবর দিঘী স্তম্ভ, ভীমের পান্টি, নীলফামারি জেলার ধর্ম পালের গড়, পটুয়াখালির মসজিদবাড়ি, সৈয়দপুরের ফিদা আলি ইন্সটিটিউট, নগর কসবা, বাহাদুর শাহ পার্কের ওবেলিস্ক , মেগালিথ স্তম্ভ ইত্যাদি।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম নিয়ে আমি গবেষণা করছি ২০০৮ সাল থেকে। প্রথম একটি গবেষণা পত্র তৈরি করি “Publicizing Tourism : Opportunity and Challenges in the Context of Bangladesh”. আর দ্বিতীয়টি ২০১৮ সালে নেদারল্যান্ডে “A communication Plan for Bangladesh Govt. to Promote Bangladesh as a Global Tourist Destination”. দুটি গবেষণা পত্রেই আমি উল্লেখ করেছি কি কি পদ্ধতি অনুসরন করা যেতে পারে বাংলাদেশকে একটি বিশ্ব পর্যটনের দেশ বানানোর জন্য।

বাংলাদেশে ৪৯ জেলা ভ্রমনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যা কিছু দেখেছি, জেনেছি, মানুষের সাথে মিশেছি সব কিছু যদি লিপিবদ্ধ করতে চাই, তাহলে এক জীবন অনেক কম । 

আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি হেরিটেজ টুরিজমের জন্য বাংলাদেশ একদিন পৃথিবীর তাবত পর্যটকদের কাছে অন্যতম গন্তব্যে পরিনত হবে।”

ছবি এবং লেখা – Eliza Binte Elahi

This post is powered by ISFiT Bangladesh

#ElizaBinteElahi #Day3 #100DaysOfPositivity#SpreadPositivity #PositiveBangladesh