খেলোয়াড় হিসেবে তিনি দারুণ গোছানো, দলের সবচেয়ে সিনিয়র ক্রিকেটারদের একজন হয়েও প্র্যাকটিসে এখনো সবচেয়ে বেশি সময় তিনিই দেন।মুশফিকুর রহিমের দলের প্র‍তি নিবেদন নিয়ে কখনোই কোন প্রশ্ন নেই।

তবে একটা বিষয় নিয়ে সবসময় প্রশ্ন উঠেছে, সেটা শুরুর দিকে ছিলো ফিসফাস, পরে সময়ের সাথে জোরালো প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।সেটা হলো তার আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। যখন তিনি অধিনায়ক ছিলেন,তখন ম্যাচের ফলাফল অনূকুলে না গেলে বা নিজের পারফরম্যান্স খুব খারাপ হলে তিনি নাকি রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকতেন, যখন তার নাকি ব্যক্তি মুশফিকের চেয়ে অধিনায়ক মুশফিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা।বিপিএলে একবার বাজে ফিল্ডিং করায় তরুণ মোসাদ্দেককে মাঠ থেকে বের করে দিয়েছিলেন, সেটা নিয়েও বেশ হইচই হয়েছিলো। তাই হয়তোবা পরিসংখ্যান তাকে সফল অধিনায়ক হিসেবে তুলে ধরলেও বিশ্বকাপের মতো বড় মিশনকে মাথায় রেখে বিসিবির হর্তাকর্তারা পোড় খাওয়া মাশরাফির হাতেই আবার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অধিনায়কের ব্যান্ডেনা।

অধিনায়কত্ব তার জন্যে চাপই যে ছিলো খানিকটা, মুশফিকের ব্যাট তা গত দুই বছর প্রমাণ দিয়েছে আরো বেশি।অনেক বছর থেকেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে “মিস্টার ডিপেন্ডেবল’র ” ব্যাট যেন গত দু বছরে হয়ে উঠেছে তলোয়ারের মতো ধারালো।এই সময়ে বেশ বড় বড় কয়েকটি ইনিংস খেলেছেন, যার মধ্যে রয়েছে টেস্ট ক্রিকেটে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও।যদিনা মাহমুদুল্লাহ তাকে ২১৯ রানে রেখে ইনিংস ঘোষণা করতেন,তাহলে হয়তো উইকেটকিপারদের মধ্যে ফ্লাওয়ারের ২৩২ রানের রেকর্ড ইনিংসটিও টপকে যেতে পারতেন। 

অথচ ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন প্রথমবার দলের অতিরিক্ত সদস্য হিসেবে সতের বছরের তরুণ মুশফিক। কিন্তু প্রস্তুতি ম্যাচে পরপর ৬৩ আর ১১৭ রানের দুটো ইনিংস খেলে জায়গা করে নিলেন লর্ডসের টেস্টে।প্রথম টেস্ট ম্যাচে বলার মতো তেমন কিছুই করতে পারেন নি,পারেন নি প্রথম দিককার বছরগুলোতেও।বাংলাদেশের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা ক্রিকেটের সাক্ষী বলতে পারেন সেই মুশফিককেও।কিন্তু হামাগুড়ি দিয়ে চলা সেই দলের উত্থান দেখার সৌভাগ্য তার হয়েছে অধিনায়ক হিসেবেই। কে জানে,একসময়ের ম্যাচের পর ম্যাচে হারের যন্ত্রণায় জর্জরিত মুশফিকের কথা ভাবলে আজকের পরিণত মুশফিকের হাসিই পায় কিনা!কিংবা যেসব দলের সাথে আগে সম্মানজনক হারই ছিলো লক্ষ্য,তাদেরকে যখন দেশের মাটিতে বলেকয়ে হারায় বাংলাদেশ, মুশফিকের বুকে তখন হয়তো “সুখের মতো ব্যথা বাজে!”

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে তিনিই বোধহয় পরিবারের সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বাবা চেয়েছিলেন ছেলেকে টিভির পর্দায় দেখতে চেয়েছিলেন, তাই বিকেএসপিতে আসা।পড়ালেখায় খারাপ ছিলেন না কখনোই,তাই সেটাও চালিয়ে গেছেন পাশাপাশি। জাহাঙ্গীরনগরের মতো প্রথম শ্রেণির একটা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন বিমানে,হোটেলে বসে পড়াশোনা করে।

মুশফিক তাই নিবেদনের দিক দিয়ে একজন উজ্জ্বল ব্যতিক্রমই বলা যায়। সেটা হোক উইকেটের সামনে অথবা পেছনে,কিংবা পড়াশোনায়।

অভিষেকের আবার দেড় দশক পরে যখন সেই ইংল্যান্ডের মাটিতে বিশ্বকাপের দামামা বাজছে,সেই তরুণ মুশফিক আজ অনেক পরিণত। কতটা পরিণতি ৩২ পেরিয়ে যাওয়া মুশি,তার একদম সাম্প্রতিক প্রমাণ কাল ভারতের সাথে তার ৯০ রানের ঝকঝকে ইনিংসটা।দলের পরপর দুই উইকেট পরে যাওয়ার পর নেমেছেন, দেখেশুনে খেলে ইনিংসে মেরামতের কাজ করেছেন দক্ষ সেনাপতির মতো, আবার যখন সুযোগ পেয়েছেন প্রতিপক্ষ বোলারের উপর চড়াও হয়েছেন।এই মুশফিক যেন আত্নবিশ্বাসী বাংলাদেশের প্রতিনিধি, যিনি জানেন কিভাবে নিজের কাজটা করে যেতে হয় ধারাবাহিকভাবে। আবেগটাও নিয়ন্ত্রণে রাখা শিখে গেছেন যেন এখন,এখন আর উত্তেজিত হন না খুব সহজেই,কথার উত্তরও দেন সুচিন্তিত, মাপামাপা।

তবু একটা অতৃপ্তি আছে,সেঞ্চুরি মিস করেছেন অল্পের জন্যে,যেরকম অতৃপ্তি আছে দীর্ঘদিন বড় কোন শিরোপার কাছে গিয়েও বারবার ফিরে আসা অল্পের জন্যে। এবার যে সেটা আর চান না,সেটা বেশ আত্নবিশ্বাসের সাথেই জানিয়ে দিয়েছেন। মুশফিকের এই আত্নবিশ্বাস আর নিবেদন ছড়িয়ে পড়লে নতুন ইতিহাস রচনার হয়তো খুব কাছেই আমরা!

ছবি – Mushfiqur Rahim অফিসিয়াল ফেসবুক ফ্যান পেজ
লিখছেন – Abdullah Sadman

This post is powered by Eleutheromania

#MR15 #Day4 #100DaysOfPositivity#SpreadPositivity #PositiveBangladesh