কয়েকদিন আগে পর্দা উঠেছে ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ইভেন্ট, আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯ এর। বিশ্বকাপের ঠিক দুই তিন দিন আগে একটা মোটামুটি আড্ডার মতো প্রেস কনফারেন্স বসে দশ দলের দশ অধিনায়ককে নিয়ে। সেদিন ফেসবুকে বসে সেই প্রেস কনফারেন্সটি দেখছিলাম। এমন সময় মনে হলো, আচ্ছা, ২০০৩ বিশ্বকাপের সময় এই সেরা দশ দলের দশ অধিনায়ক কে কোথায় ছিলেন? আর তখনই মনে হলো আরে এদের কারোই তো তখনো অভিষেকই ঘটেনি ক্রিকেট মাঠে। শুধু একজন ব্যতীত। 

এবার একটু স্মৃতিপটে ঢুঁ মেরে আসুন । ২০০৩ বিশ্বকাপে লাল সবুজের বোলিং আক্রমণের নকশা সাজানো হয় যেই কিশোর ছেলেটিকে নিয়ে তাকে কোথাও খুঁজে পান ? সেই সেদিনের কৌশিকই আজকের মাশরাফি বিন মর্তুজা। বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ।আর অভিজ্ঞতা বিচারে সব অধিনায়কেরও অধিনায়ক । ২০০৩ বিশ্বকাপে যদিও পরবর্তীতে দুটোর বেশী ম্যাচ খেলতে পারেন নি ম্যাশ ইনজুরির জন্য। ইনজুরির সে আরেকটা শব্দ । মাশরাফির সমস্ত ক্যারিয়ার ধরেন বা তার জীবনের অর্ধেকটাই ধরেন, এই ইনজুরি জিনিসটা থেকে পার পেয়ে উঠতে পারেননি তিনি। তবুও লড়েছেন, লড়ছেন হ্যাঁ সামনেও লড়বেন। ক্রিকেটে হোক, ক্রিকেটের বাইরে হোক মাশরাফি মানেই লড়াকু সেনানী।

২০০১ এ মাত্র সতেরো বছর বয়সে ক্রিকেট মাঠে অভিষেক ঘটে ম্যাশের। না ম্যাশ না তখন তিনি দুর্দান্ত গতির কৌশিক ।আজকে যারা আমরা টিভি পর্দায় ১২০-১৩০ গতির ম্যাশকে দারুন লাইন লেন্থ ধরে রেখে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে দেখি, তারা কি জানি মাত্র সতেরো বছর বয়সে একজন ফাস্ট বোলারের ক্রিকেট অভিষেক হওয়াটা কতটা অস্বাভাবিক ! অস্বাভাবিক বটে যদি না সতেরো বছরের এক কিশোরের গতি ঝড় তুলতে পারে ২২ গজের পিচে । মাশরাফির সেই ঝড় তুলেই অভিষেক। এরপর একে একে ইনজুরি। ২০০১ এর নিউজিল্যান্ড সফর, ২০০৩ এর বিশ্বকাপ, ২০০৬, ২০০৯ আর যেটার আক্ষেপ হয়তো মাশরাফিকে আজীবন পোড়াবে , ২০১১ এর ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে শুধুই দর্শক বনে থাকা। পায়ে ছুরি পড়েছে বারবার, বারবার বিরতি, বোলিংয়ের গতি কমে আসা, বারবার থেমে গেছেন তবে বসে পরেন নি। আর এটাই হয়তো আমাদের আর গোটা বিশ্বকে সবচেয়ে বেশী অবাক করে। ইনজুরির কবলে পড়ে কত প্রতিভাবান ক্রিকেটের ক্যারিয়ার থেমে গেলো, ফাস্ট বোলারদের জন্যে এতো আরো সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সাধারণ ব্যাপার গুলায় সন্তুষ্ট থাকার মানুষ নন ম্যাশ। তাই প্রতিবার ইনজুরির পর প্রতিবার আরো জীবন সঞ্চয় করে ফিরে এসেছেন। 

তাই এবারের বিশ্বকাপে যতটা ভরসা দলের পাঁচ পান্ডব, এক ঝাঁক তরুন পারফর্মারের উপর ততোটাই আস্থা একজন অধিনায়ক মাশরাফির উপর। 

হ্যাঁ আমাদের জাতীয় জীবনের ক্রিকেটের ভূমিকা অনেক । আমাদের প্রতিদিন সকাল শুরু হয় পত্রিকার কোনো না কোনো নেগেটিভ হেডলাইনে। দুই একদিন একটু ব্যতিক্রম ঘটে, যেদিন ক্রিকেট মাঠে ব্যাটে বলে অসাধারণ কিছু করে বসে টাইগার বাহিনী। ক্রিকেট আমাদের অনেক হতাশার মধ্যে অনেকটুকু আলোর জায়গা। আর আলোর জায়গাটি খুব যত্ন করেই আগলে রেখেছেন দলের সকলের ভাই, অভিভাবক মাশরাফি বিন মোর্তাজা। তবে মাশরাফি কেবল একজন ক্রিকেটের কিংবদন্তি নন, আমাদের জীবনে মাশরাফি তার ক্রিকেটার পরিচয় ছাপিয়ে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে বেশী উজ্জ্বল। মাশরাফি আমাদের জীবনে সততা, বিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের জ্বালানী জোগান। মাশরাফি আমাদের ভালোবাসতে শেখান। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত বধের ম্যাচে শেবাগের স্ট্যাম্প উপড়ে নেবার দৃশ্যটি মনে আছে? সারা গায়ে আগুন তেতানো জ্বর নিয়ে সেদিনের ম্যান অব দ্যা ম্যাচ মাঠে নেমেছিলেন নিজের বন্ধু মানজারুল রানার জন্য একটি ম্যাচ জিততে। হ্যা, এটাই মাশরাফি। মাশরাফিকে পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। বোকা বিশ্লেষকররা তাই বারবার ভুল করে ম্যাশ কে উপেক্ষা করে। কিছু মানুষ থাকেন পরিসংখ্যানের উপরে, যাদের ইমপ্যাক্ট আছে, যারা মাঠে থাকা মানেই ভরসা কাজ করা, যারা দলের হাল ধরলে দল হয় উজ্জীবিত, ক্যাপ্টেন মাশরাফি তেমনই একজন। ২০১৯ বিশ্বকাপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ।

যদি দেখেন ক্রিকেট মাঠে তার দিকে তেড়ে আসছে কোনো পাগলা দর্শক। ভয় পাবার কিছু নাই। ম্যাশ তাকে জড়িয়ে ধরবেন, লাগলে আরেকবার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনির সাথে ঝগড়া করবেন । শুধু কি তার ভক্তরাই পাগলা? 

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক কোচ ডেভ হোয়াইট্মোর সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটির নামই দিয়ে দিয়েছিলেন পাগলা বলে। পাগলই বটে।

লিখেছেন – Mohammad Sifat

This post is powered by The Hippycrites

#MASH02 #Day7 #100DaysOfPositivity#SpreadPositivity #PositiveBangladesh