August 16, 2019

আতাউল করিম: বিশ্বসেরা বাংলাদেশি পদার্থবিজ্ঞানী

ব্রেইন ড্রেইন (Brain Drain) বলে একটি পরিভাষা প্রচলিত আছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। এর মানে হলো, দেশের মেধাবী ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মস্তিষ্কগুলোর উন্নততর জীবন যাপন অথবা উচ্চতর গবেষণার জন্য উন্নত দেশে পাড়ি জমানো এবং দেশে ফিরে না এসে সেখানেই রয়ে যাওয়া।

নিঃসন্দেহে স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে এমনই এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হাজারো মেধাবী মানুষ আমাদের দেশ থেকে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ হয়ে চলে গেছেন উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে এবং এখনো যাচ্ছেন। এটি দেশ ও জাতির জন্য এক ধরনের আত্মঘাতী পরিস্থিতি, বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য। তবে কিছু কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা ভিন্ন। তারা দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা ও ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে এসেছেন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে, অথবা দেশে না ফিরলেও সেই দেশে থেকেই স্বদেশের জন্য বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন। এদেশের এমনই এক সূর্যসন্তান হলেন পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক মোহাম্মদ আতাউল করিম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি এই বিজ্ঞানী বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে পরিচিত।

মোহাম্মদ আতাউল করিম (জন্ম ৪ মে, ১৯৫৩) একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথের প্রোভোস্ট এবং এক্সিকিউটিভ ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে কর্মরত আছেন। তার বাবা ছিলেন চিকিৎসক এবং মা একজন গৃহিণী, স্ত্রী সেতারা একজন প্রাণরসায়নবিদ।

ড. আতাউল করিম অপটিক্যাল সিস্টেম, অপটিক্যাল কম্পিউটিং এবং প্যাটার্ন রিকগনিশনে বিশ্বের শীর্ষ ৫০ গবেষকের মাঝে অন্যতম, যারা অ্যাপ্লায়েড অপটিক্সের ৫০ বছরের ইতিহাসে সর্বাধিক অবদান রেখেছেন।

আতাউল করিম বিভিন্ন রকম গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন ১৯৮৭ সাল থেকে, কিন্তু ম্যাগলেভ ট্রেনের গবেষণা তাকে সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধ করে তোলে। আতাউল করিম ভার্জিনিয়ার নরফোকের ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতাকালে ম্যাগলেভ ট্রেন নিয়ে গবেষণাটি করেছিলেন। ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ৭ বছর ধরে এ ধরনের একটি ট্রেন তৈরির চেষ্টা করছিলেন, তবে সাফল্যের দেখা পাননি। ২০০৪ সালে এই গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন ড. আতাউল করিম। এরপর তিনি মাত্র দেড় বছরে ট্রেনটির প্রযুক্তি নির্মাণে সক্ষম হন এবং গবেষণায় পরীক্ষামূলকভাবে সফল হন।

তিনি শুধু গবেষক নন, একজন ইন্সট্রাকটরও। তার গবেষণা কীভাবে প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হবে এবং কীভাবে বাস্তব রূপ নেবে সেটির সঠিক ও উপযুক্ত নির্দেশনা তিনি নিজেই দিয়ে থাকেন। যদিও জার্মানি, চীন ও জাপানে ঘণ্টায় ১৫০ মাইলের বেশি বেগে চলমান ম্যাগলেভ ট্রেন আবিষ্কৃত হয়েছে আগেই; তবু ড. করিম যুক্তরাষ্ট্র তথা সমগ্র বিশ্বকে এমন এক ম্যাগলেভ ট্রেন উপহার দিয়েছেন, যেটি খরচের দিক থেকে খুবই সাশ্রয়ী, দৃষ্টিনন্দন এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন। এই ধরনের ট্রেনের জন্য প্রতি মাইল ট্র‍্যাক বা লাইন প্রস্তুত করতে এর আগে গড়ে খরচ করতে হতো ১১০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ড. আতাউল করিমের নেতৃত্বাধীন দলের আবিষ্কৃত এ ট্রেনে খরচ হবে মাত্র ১২ থেকে ১৩ মিলিয়ন ডলার! আকর্ষণীয় এ ট্রেনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি চালু হওয়ার পর এর চাকা আর লাইনকে স্পর্শ করবে না।

সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও বাংলাদেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন আতাউল করিম। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন কম্পিউটার এন্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্যোগ নেন বাংলাদেশে। এখন এই সম্মেলনটি এ দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী সম্মেলনে পরিণত হয়েছে। অতিথি সম্পাদকদের ৫টি দলের সহযোগিতায় তিনি প্রকাশ করেছেন ২০টি জার্নাল। এসব জার্নালে আলোচনা করা হয়েছে বাংলাদেশের যোগাযোগ, কম্পিউটিং, মাল্টিমিডিয়া, নেটওয়ার্ক এবং সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয়বস্তু নিয়ে। তার সম্পাদিত ‘টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ এন্ড ডিজাইন ইস্যু ইন বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ শীর্ষক বইটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বিজ্ঞানচর্চার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কারণ এ বইয়ের ১৬টি অধ্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ সহ ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, ভারত ও কানাডার গবেষকদের লেখা, যা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে আছে।

অধ্যাপক ড. আতাউল করিমের মতো মানুষকে এ দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা সহায়তা দিলে হয়তো তিনি দূর পরবাসে প্রবাসী হতেন না। এ দেশের এমন অসংখ্য মেধাবী মানুষ দেশেই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার যথাযথ সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই তারা অনন্যতার স্বাক্ষর রাখবেন সর্বত্র। ড. আতাউল করিম বাংলাদেশের গর্ব, তার অসাধারণ সৃষ্টিশীলতা যুগে যুগে প্রেরণা যোগাবে এদেশের বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষদের।

লেখা - Zobair Mehran (Roar বাংলা)
ছবি - The Daily Star
তথ্যসূত্র - হালিম, হিটলার এ.; ২০০৪, বাংলাদেশের সেরা বিজ্ঞানী; বাঙালি গবেষক ড. আতাউল করিম।

#AtaulKarim #MaglevTrain #RoarBangla #Day39 #100DaysOfPositivity#SpreadPositivity #PositiveBangladesh