আরবি শব্দ ‘শাহরিয়ার’ অর্থ রাজা। শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী রাজার আসনেই যেন বসেছেন। তাঁকে মনের সবচেয়ে উঁচু আসনে বসিয়েছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যুৎ-বঞ্চিত মানুষেরা। সৌরশক্তি ব্যবহার করে মানুষের জীবন আলোকিত করে তুলেছেন এই তড়িৎ প্রকৌশলী ও গবেষক।

এক যুগ হয়ে গেছে। ২০০৭ সালের ৫ মে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ছুটির দিনের তরুণ সংখ্যায় উঠে এসেছিল আট সম্ভাবনাময় তরুণের গল্প। তরুণদের মধ্যে ছিলেন ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, অভিনয়শিল্পী চঞ্চল চৌধুরী ও সংগীতশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণব। সঙ্গে ছিলেন শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী নামের এক প্রকৌশলী। সাকিব আল হাসানকে এখন বিশ্ব চেনে, চঞ্চল চৌধুরী ও অর্ণব মানুষের কাছে অতিপ্রিয় দুই নাম। আর শাহরিয়ার? নবায়নযোগ্য শক্তি বিষয়ে আগ্রহ থাকলে শাহরিয়ারকে চিনতেই হবে। আরবি শব্দ ‘শাহরিয়ার’ অর্থ রাজা। শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী যেন রাজার আসনেই বসেছেন। তাঁকে মনের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটিতে বসিয়েছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যুৎ-বঞ্চিত মানুষেরা। সৌরশক্তি ব্যবহার করে মানুষের জীবন আলোকিত করে তুলছেন শাহরিয়ার।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস কৌশলে স্নাতক করেন শাহরিয়ার। যোগ দেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সরকারি চাকরিতে। তারপর জার্মান সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান সে দেশের ওল্ডেনবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সৌরশক্তি ও হাইড্রোজেন গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করতে করতে চমকজাগানিয়া এক কাজ করে ফেলেন শাহরিয়ার। উদ্ভাবন করেন বিশেষ এক সৌরবিদ্যুৎ কোষ (সোলার সেল), যা সূর্যের আলো থেকে প্রচলিত সোলার প্যানেলের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

ওল্ডেনবুর্গে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে স্নাতকোত্তর পর্ব শেষ করেন শাহরিয়ার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে পাঁচজনই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। চাইলে তিনিও স্থায়ী হতে পারতেন জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে। কিন্তু ২০০৭ সালে ফিরে আসেন দেশে। পিডিবির চাকরি ছেড়ে যোগ দেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ)। বিশ্ববিদ্যালয়টির স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি কোর্সের সিলেবাস তৈরি করেন শাহরিয়ার, বাংলাদেশে যা ছিল প্রথম। পাশাপাশি সৌরশক্তির ফলিত শাখায় গবেষণাকাজ শুরু করতে ২০০৯ সালে ইউআইইউতে চালু করেন সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ। দেশে ও বিদেশে এ পর্যন্ত শাহরিয়ারের অধীনে ১৫০টির মতো প্রকল্প আলোর মুখ দেখেছে।

ঢাকার ধানমন্ডিতে শাহরিয়ারের গবেষণাগার। আগে যে ভবনে ইউআইইউয়ের ক্যাম্পাস ছিল, সে ভবনের একদম চিলেকোঠায়। গবেষণাকর্ম দেখাতে দেখাতে বলছিলেন, ‘পিডিবিতে থাকার সময় উপলব্ধি করেছিলাম, প্রাকৃতিক গ্যাস ছাড়া আমাদের নিজস্ব অন্য কোনো জীবাশ্ম জ্বালানির সম্ভার নেই। প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডারও ক্রমশ কমতির পথে। ফলে নবায়নযোগ্য শক্তিই যে আমাদের ভবিষ্যৎ হতে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরিত হয়, যেগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী।’

পৃথিবীর তাপমাত্রা নিরাপদ মাত্রায় রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখে যেতে হলে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার ছাড়া উপায় নেই। এই চিন্তা থেকেই ২০১৭ সালে শাহরিয়ার কাজ শুরু করেন জামালপুরের সরিষাবাড়ী থেকে। নকশা করেন বাংলাদেশের প্রথম গ্রিড-সংযুক্ত সোলার পিভি প্রকল্পের। ৩ দশমিক ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওই প্রকল্প ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে জাতীয় গ্রিডে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে শুরু করেছে। এ ছাড়া আরও দুটি বড় আকারের গ্রিড-সংযুক্ত সোলার পিভি প্রকল্পের নকশাও করেছেন শাহরিয়ার। কাপ্তাইয়ে পিডিবির ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং পঞ্চগড়ে সিম্পার ১০ দশমিক ৩ মেগাওয়াটের ওই প্রকল্প দুটি সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য আরও বড় গ্রিড-সংযুক্ত সোলার পিভি প্রকল্পের কাজেও শাহরিয়ার যুক্ত আছেন ওতপ্রোতভাবে।

বাংলাদেশের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ-সংযোগ মানে আকাশকুসুম কল্পনা ছিল। শাহরিয়ার তেমন কিছু এলাকায় এ পর্যন্ত ২৩টি সোলার-ডিজেল সংকরজাতীয় মিনি গ্রিডের নকশা করেছেন। এই মিনি গ্রিডগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিচ্ছে। শাহরিয়ারকে তৃপ্তি দেয় এই মিনি গ্রিডের নকশাগুলো। বলছিলেন, ‘সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত এক চরে মিনি গ্রিডের নকশা করেছিলাম। মধ্যে একবার প্রকল্প এলাকা থেকে ঘুরে আসতে হয়েছিল। তো সেবার চরের এক বৃদ্ধ আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, জীবিকার তাগিদে জীবনের বড় একটা অংশ তিনি বাড়ি থেকে দূরে ছিলেন। গাজীপুরে লন্ড্রি চালাতেন। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে এলে সেই ব্যবসাই শুরু করলেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁর এই ফিরে আসার আনন্দ আমাকেও অনুপ্রাণিত করেছে।’

বলতে গেলে ঠিক এ রকম কারণেই জার্মানি থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন শাহরিয়ার। দেশের মাটিতেই যদি অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানো যায়, ভিনদেশে কেন পড়ে থাকবেন? মা-বাবা মারা গেছেন। দুই ছেলে আর স্ত্রী নিয়ে সংসার।

প্রতিটি মিনি গ্রিডের নকশা শাহরিয়ার এমনভাবে করেছেন, যাতে এক থেকে দেড় হাজার গ্রামীণ পরিবার এবং দু-তিনটি গ্রামীণ বাজার ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ পায়। এই মিনি গ্রিডগুলোর কারণে মানুষের জীবনে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। শিক্ষার্থীরা অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারছে, মানুষ মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারছে, টিভি দেখছে, নিজেদের সংযুক্ত করতে পারছে ইন্টারনেটের সঙ্গে। মাড়াইকল, ফটোকপি মেশিন, করাতকল, ছোটখাটো ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, বরফকলের মতো ছোট পরিসরের ব্যবসাও হচ্ছে জমজমাট।

শাহরিয়ার সম্প্রতি সৌরশক্তি-বিষয়ক জাতীয় পর্যায়ের নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য পেশাদার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন প্রায় নিয়মিত। নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য ছুটছেন, আপনার চালিকা শক্তি কী? শাহরিয়ারের জবাব, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কার্বন নিঃসরণমুক্ত বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার স্বপ্নটাই আমার চালিকা শক্তি।’

*শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরীর যত পুরস্কার

– অদম্য বাংলাদেশ ও অনির্বাণ আগামী পুরস্কার। জাতীয় বিদ্যুৎ সপ্তাহ। ২০১৬ ও ২০১৮।
– জাতিসংঘের মোমেন্টাম ফর চেঞ্জ পুরস্কার। জাতিসংঘের জলাবায়ু সম্মেলন (কোপ ২২), মারাকেশ, মরোক্কো। ২০১৬।
– ইন্টারসোলার (ইউরোপ) অ্যাওয়ার্ড, মিউনিখ, জার্মানি। ২০১৬।
– এডুকেশন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০১৮। সপ্তম ওয়ার্ল্ড এডুকেশন কংগ্রেস, মুম্বাই, ভারত।
– এশিয়ান ফটোভল্টেয়িক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এপিভিআইএ) অ্যাওয়ার্ড, সাংহাই, চীন। ২০১৯।

লেখা এবং ছবি – মাহফুজ রহমান (Chutir DineProthom Alo)

#ShahriarAhmedChowdhury #CenterForEnergyResearch #UIU #Day38#100DaysOfPositivity #SpreadPositivity #PositiveBangladesh